ইলিশের বাজারে বাড়তি দাম ও ক্রেতাদের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে আসল ইলিশের পরিবর্তে চন্দনা ও সুরমা মাছ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। দেখতে কিছুটা সাদৃশ্য থাকায় অনেক ক্রেতাই এসব মাছকে ইলিশ ভেবে কিনছেন। বিশেষ করে হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্না করা মাছ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আসল ইলিশের সঙ্গে অন্য মাছের পার্থক্য শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চন্দনা ইলিশের কাছাকাছি প্রজাতির মাছ হলেও এটি প্রকৃত ইলিশ নয়। অন্যদিকে সুরমা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির মাছ। মাছের শারীরিক গঠন, গায়ের রং ও দাগের ধরন পর্যবেক্ষণ করে এদের মধ্যে পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করতে পারেন ক্রেতারা।
ইলিশের বৈশিষ্ট্য কী?
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha। এটি মূলত সামুদ্রিক মাছ হলেও প্রজননের জন্য নদীতে চলে আসে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ দেশের বিভিন্ন নদীতে ইলিশের বিচরণ রয়েছে। ২০১৭ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
চন্দনা ইলিশ নয়, আলাদা প্রজাতির মাছ
চন্দনার বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa toli। উপকূলীয় অঞ্চল, নদীর মোহনা ও জোয়ার-ভাটাপ্রবণ এলাকায় এ মাছ পাওয়া যায়। অঞ্চলভেদে এটি ‘চন্দনা ইলিশ’ বা ‘ফুইট্টা ইলিশ’ নামে পরিচিত। ইংরেজিতে মাছটি টোলি শ্যাড নামে পরিচিত।
চন্দনার দেহ সাধারণত রুপালি রঙের হয়, কখনো তাতে হলদে আভাও দেখা যায়। ফুলকার পেছনে অস্পষ্ট কালচে ছাপ থাকতে পারে। এর ওপরের চোয়ালের মাঝামাঝি অংশে ছোট একটি খাঁজও রয়েছে। সাধারণত চন্দনা ইলিশের চেয়ে আকারে ছোট হয়। তবে শুধু আকারের ভিত্তিতে মাছ দুটি আলাদা করা সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়।
চন্দনা নামটি নিয়েও রয়েছে কিছু বিভ্রান্তি। Sardinella melanura প্রজাতির আরেকটি সামুদ্রিক মাছও কোনো কোনো এলাকায় চন্দনা ইলিশ নামে পরিচিত। ইংরেজিতে এটি ব্ল্যাকটিপ সার্ডিনেলা নামে পরিচিত। বাংলায় কোথাও একে ‘কালটিপ তাকিয়া’ বলা হয়। এর লেজের ডগায় কালচে রং থাকে। ফলে শুধু স্থানীয় নামের ওপর নির্ভর করে মাছের প্রকৃত প্রজাতি শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
সুরমা মাছ চেনার উপায়
সুরমা মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Scomberomorus commerson। এটি ম্যাকেরেল পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং ইংরেজিতে কিং ম্যাকেরেল নামে পরিচিত। অঞ্চলভেদে মাছটি ‘ডোরা মাইট্টা’ বা ‘চম্পা’ নামেও পরিচিত।
সুরমার দেহ লম্বাটে এবং দুই পাশ কিছুটা চাপা। পিঠের রং নীলচে-রুপালি, আর পেটের অংশ সাদাটে। শরীরজুড়ে সারিবদ্ধ কালচে খাড়া দাগ থাকে। এ ছাড়া এর চোয়ালে শক্ত দাঁত রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য সুরমাকে ইলিশ থেকে আলাদা করতে সহায়তা করে।
ইলিশের দাম বাড়লে বাড়ে প্রতারণার ঝুঁকি
ইলিশের উচ্চমূল্যকে কেন্দ্র করে ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চাঁদপুরের মাছঘাটে এ বছর প্রতি কেজি ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে জানা গেছে। সরবরাহ কমে যাওয়া ও দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগে কিছু অসাধু বিক্রেতা অন্য প্রজাতির মাছকে ইলিশ বলে বিক্রি করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সার্ডিন, চৌক্কা, চন্দনা, চকোরি ও টাকিয়াসহ বিভিন্ন মাছকে ইলিশ নামে বিক্রির অভিযোগ উঠে এসেছে। আস্ত মাছের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ক্রেতারা কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে পার্থক্য বুঝতে পারলেও কাটা কিংবা রান্না করা মাছের পরিচয় নির্ধারণ করা অনেক বেশি কঠিন।
জাটকা ও চন্দনা এক নয়
মাছের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির ক্ষেত্রে জাটকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জাটকা হলো ইলিশের কিশোর পর্যায়ের মাছ; এটি আলাদা কোনো প্রজাতি নয়। অন্যদিকে চন্দনা একটি স্বতন্ত্র প্রজাতির মাছ। তাই ছোট আকারের মাছ দেখেই সেটিকে জাটকা কিংবা চন্দনা বলে নিশ্চিত হওয়া ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছের বৈজ্ঞানিক নাম জানা থাকলে এ ধরনের বিভ্রান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কারণ একই মাছ বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন নামে পরিচিত হতে পারে। আবার একই স্থানীয় নামে একাধিক প্রজাতির মাছও বিক্রি হতে পারে।
মাছ কেনার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
বাজার থেকে মাছ কেনার সময় সম্ভব হলে আস্ত মাছ বেছে নেওয়া ভালো। মাছের দেহের গঠন, রং, গায়ের দাগ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য খেয়াল করতে হবে। সুরমার শরীরে সাধারণত স্পষ্ট খাড়া কালচে দাগ দেখা যায়। অন্যদিকে চন্দনার দেহে রুপালি রঙের সঙ্গে হলদে আভা ও ফুলকার পেছনে কালচে ছাপ থাকতে পারে। তবে একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে মাছের প্রজাতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
হোটেল বা রেস্তোরাঁয় ইলিশের পদ অর্ডার করার সময় মাছটির পরিচয় সম্পর্কে জেনে নেওয়া যেতে পারে। দাম বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম হলে কিংবা বিক্রেতা মাছের পরিচয় স্পষ্ট করতে না চাইলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ইলিশ বাংলাদেশের নদী, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। চন্দনা ও সুরমারও নিজস্ব খাদ্যগুণ ও পরিচয় রয়েছে। কিন্তু এসব মাছকে ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা হলে তা ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তাই মাছের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা, বিক্রেতাদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং ভোক্তাদের সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
সান নিউজ/ রাব্বি