বাস স্টপে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন, কিংবা কোনো ক্যাফেতে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন—হঠাৎ পাশ থেকে ভেসে এল সিগারেটের তীব্র গন্ধ। নিজের অজান্তেই নাক কুঁচকে সরে দাঁড়ালেন। মনে হতে পারে, আপনি তো সিগারেট খাচ্ছেন না, তাই আপনার কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু সত্যি কি তাই? চিকিৎসাবিজ্ঞান আর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। সিগারেট নিজে না ছুঁয়েও অন্যের ছাই বা ধোঁয়ায় নিঃশব্দে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছেন লাখো মানুষ।
তামাকজাত পণ্যের এই পরোক্ষ বা সেকেন্ডহ্যান্ড ধোঁয়া এখন শুধু ভারতের মতো জনবহুল দেশেই নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এক বিরাট জনস্বাস্থ্য সংকট। সম্প্রতি একটি গবেষণার বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ৪৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ অন্যের তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, এই মারাত্মক ধোঁয়ার বিষক্রিয়ায় ওই এক বছরেই প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার মানুষ। আর বিশ্বজুড়ে এই মৃত্যুর সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে সাড়ে ১৬ লাখ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুরুষদের তুলনায় নারীরা ঘরের ভেতরে এই পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও এর আশপাশের অঞ্চলে পুরুষদের তুলনায় নারীদের এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসার হার প্রায় ৫৯ শতাংশ বেশি। এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ঘরের ভেতরে পুরুষদের ধূমপান করার অভ্যাস। যার ফলে একজন ধূমপায়ীর নেশার খেসারত দিতে হচ্ছে তার স্ত্রী, মা কিংবা পরিবারের অবুঝ শিশুদের। গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হওয়া মানুষের বড় একটা অংশই শিশু, যাদের বারবার আক্রান্ত হতে হচ্ছে ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে।
আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ কোথায় : ভারতে ২০০৩ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালের সংশোধনী অনুযায়ী বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, হাসপাতাল বা রেস্তোরাঁসহ সব জনবহুল স্থানে ধূমপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা একেবারেই আলাদা। সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বহু জনবহুল স্থানে এই নিয়ম মানার হার অর্ধেকেরও কম। বিশেষ করে বাসস্টপ বা বাজারের মতো ভিড়ভাট্টার জায়গায় আইন ভাঙার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। কড়া নজরদারি ও নিয়মিত জরিমানার অভাবে আইন যেন কেবল কাগজের পাতাতেই বন্দি হয়ে আছে।
ধূমপান ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হতে পারে, কিন্তু অন্যের বিশুদ্ধ বাতাসে বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার অধিকার কারো নেই। সকালে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে পার্কের স্নিগ্ধ হাওয়া কিংবা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ক্লান্ত মানুষের শ্বাসের অধিকারে ভাগ বসানোর এই প্রবণতা এবার থামানো দরকার। বাস স্টপ কিংবা জনবহুল চত্বরে ধূমপানকে আর ‘সামান্য অপরাধ’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; কারণ এই ছোট্ট অবহেলাই কেড়ে নিতে পারে একটি নিষ্পাপ প্রাণ।
সান নিউজ/রাজীব