ছবি: সংগৃহীত
বাণিজ্য
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের প্রতিবেদন

প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় নতুন করে চাপে দেশের অর্থনীতি

বাণিজ্য ডেস্ক

বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান যৌথ বার্ষিক সভা উপলক্ষে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু কঠিন বার্তা উঠে এসেছে। বিশ্ব অর্থনীতি যখন এক অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির উচ্চ চাপ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির শ্লথ গতি নীতিপ্রণেতা ও সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং সার্বিক বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আইএমএফের পূর্বাভাস: জিডিপি কমবে, বাড়বে মূল্যস্ফীতির চাপ
আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে। এর আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশে এসে ঠেকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রবৃদ্ধি কমার এই আশঙ্কার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আগের অর্থবছরে (২০২৫–২৬) ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর মাসেও সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক হিসাবে আগামী দিনে বাজারে জিনিসপত্রের দামের চাপ আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

তুলনার জন্য বৈচিত্র্যময় বৈশ্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ২০২৭ সালে তা ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ধীরে ধীরে কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসার কথা থাকলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চিত্রটি এর উল্টো পথেই হাঁটছে।

বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিতে কাঠামোগত দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ
বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ (যার প্রতিপাদ্য ছিল— ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’) প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির বেশ কিছু মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলো এখন বেশ জোরালো ধাক্কা খাচ্ছে:

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা: বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ দিন দিন সীমিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উৎপাদনে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট: জ্বালানি ও বিদ্যুতের অব্যাহত সংকটের কারণে কলকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা সামগ্রিক সাপ্লাই চেইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ব্যাংক খাতের অস্বস্তি: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং মূলধন–ঘাটতির মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।

সামাজিক সুরক্ষার সুষম বণ্টনের অভাব: বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকার বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিলেও এর প্রকৃত সুফল গরিব মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে সচ্ছল পরিবারগুলো এই সুবিধার আওতায় চলে আসলেও প্রকৃত দরিদ্রতম বহু পরিবার বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই যৌথ মূল্যায়নগুলো প্রমাণ করে যে, কেবল প্রথাগত উপায়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব নয়। দেশের অর্থনীতিকে এই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে প্রতিবেদনগুলোতে কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:

আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো: ব্যাংক খাতের সুশাসন কঠোরভাবে নিশ্চিত করে খেলাপি ঋণ আদায় এবং মূলধন সংকট দূর করতে হবে।

লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা: সাধারণ ও অপরিকল্পিত ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে সেই অর্থ সরাসরি দরিদ্র, অসহায় ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে।

রাজস্ব আয় বৃদ্ধি: করজাল সম্প্রসারণ এবং কর আদায়ে স্বচ্ছতা এনে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: শিল্প কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নীতিনির্ধারক মহলে দূরদর্শী ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করা না গেলে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।

সান নিউজ / রাজীব

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

নতুন ভবন হলেও যে কারণে দুর্ভোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার বৈখর অনির্বাণ সরকারি প্রাথমিক ব...

তুরস্কে সাত ম্যাচ খেলেই রেকর্ড গড়লেন সালাহ

তুরস্কের শীর্ষ লিগে একটি নতুন রেকর্ড গড়লেন মোহাম্ম...

কানাডায় বিনা খরচে মাস্টার্স ও পিএইচডি করার সুযোগ

আমরা জানি, উন্নত জীবন আর শিক্ষামানের আশায় অনেকেই দ...

দুই দিন এলপিজি বিক্রি বন্ধ থাকবে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি বন্ধ, কমিশন পু...

দশ দিনের জন্য বাতিল ইউএস-বাংলার ঢাকা-রিয়াদ সব ফ্লাইট

রিয়াদ বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার কারণে ঢাক...

গভর্নরের শাসনের বিরুদ্ধে আদালতে যাবে ইমরানের দল

খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে গভর্নরের শাসন জারি ও জরুরি অবস্থা ঘোষণাকে কেন্দ্র...

সাক্ষাৎকারে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানালেন অভিনেত্রী

দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী নীতি টেলর সম্প্রতি নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্...

প্রাক্তন স্ত্রীর বিয়েতে ‘স্পাইডার-ম্যান’ তারকা

প্রাক্তন স্ত্রী জেনিফার মেয়ারের নতুন জীবনের শুরুতে পাশে দাঁড়িয়ে আলোচনায় এসেছ...

প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় নতুন করে চাপে দেশের অর্থনীতি

বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান যৌথ বার্ষিক সভা উপল...

‘আত্মগোপনে’ সৌদি যুবরাজ

ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের ঘন ঘন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হাম...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা