-
মহাকাশ জয়: ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন সিস্টেম ‘ন্যাভিক’-কে আরও শক্তিশালী ও নির্ভুল করতে সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি দিল সর্বাধুনিক উপগ্রহ ‘এনভিএস-০৩’।
-
কোথা থেকে উৎক্ষেপণ: গতকাল শুক্রবার রাতে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা থেকে শক্তিশালী জিএসএলভি-এফ১৮ রকেটের মাধ্যমে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়।
-
সবচেয়ে বড় অর্জন (দেশীয় প্রযুক্তি): অতীতে বিদেশ থেকে আনা পারমাণবিক ঘড়িতে ত্রুটি দেখা দিলেও, এবার এই স্যাটেলাইটে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি পারমাণবিক ঘড়ি যুক্ত করা হয়েছে। যা ভারতকে প্রযুক্তিতে আরও আত্মনির্ভর করেছে।
-
সাধারণ মানুষের সুবিধা: নতুন এই স্যাটেলাইটে জনপ্রিয় ‘এল ওয়ান’ (L1) সংকেত থাকায় ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোন, বিমান চলাচল এবং পরিবহন খাতে এটি অত্যন্ত সহজে ব্যবহার করা যাবে।
-
ভৌগোলিক পরিধি: এই সিস্টেমটি দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত নিখুঁত লোকেশন ও সঠিক সময়ের হিসাব দিতে পুরোপুরি সক্ষম।
একসময় যে রকেটটিকে প্রযুক্তির গ্যাঁড়াকলে পড়ে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর ‘দুষ্টু ছেলে’ বলে ব্যঙ্গ করা হতো, সেই জিএসএলভি রকেটটি আজ সমস্ত অনিশ্চয়তা উড়িয়ে দিয়ে ভারতের মহাকাশ গবেষণার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী তুরুপের তাস।
এই রকেটের হাত ধরেই ভারতের নিজস্ব এবং অত্যন্ত নিখুঁত গ্লোবাল নেভিগেশন সিস্টেম ‘ন্যাভিক’-কে আরও বহু দূর এগিয়ে দিতে মহাকাশে এক যুগান্তকারী ও সফল পদার্পণ ঘটল সর্বাধুনিক স্যাটেলাইট ‘এনভিএস-০৩’-এর। এই সাফল্যের ফলে বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব আবারও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেল।
বিশিষ্ট গণমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা অবস্থিত ঐতিহাসিক সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে মহাশূন্যের দিকে ধেয়ে যায় জিএসএলভি-এফ১৮ রকেট। নির্দিষ্ট গতিপথ মেনে শক্তিশালী রকেটটি নিখুঁতভাবে তার গন্তব্যে পৌঁছে নতুন উপগ্রহটিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপন করেছে।
এরকম মহাজাগতিক সাফল্যের পরই ইসরো প্রধান ভি নারায়ণন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে দেশবাসীকে জানান যে, এই অভাবনীয় অর্জনের মাধ্যমে ভারত এখন আরও বেশি নিখুঁত সময় পরিমাপ এবং নির্ভুল দিকনির্দেশনা ব্যবস্থার একেবারে দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়ছে। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এই অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক সাফল্যে যারপরনাই আনন্দ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও, যিনি সরাসরি ইসরো টিমকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালের উত্তপ্ত কারগিল যুদ্ধের সেই সংকটময় দিনগুলোতে শত্রুর মোকাবিলায় এবং নিজস্ব ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারত পুরোপুরি স্বাধীন একটি নেভিগেশন সিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, যা পরবর্তীতে আজকের জনপ্রিয় ‘ন্যাভিক’ (NavIC) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
দেশের ভৌগোলিক সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিখুঁত লোকেশন ট্র্যাকিং এবং নির্ভুল সময়ের নিখুঁত হিসাব দিতে পুরোপুরি সক্ষম এই সিস্টেমটি। তবে এই দীর্ঘ অভিযাত্রার পথ মোটেও ফুল বিছানো ছিল না। অতীতে এরকম উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টের যাত্রাপথে একাধিক বড়সড় ধাক্কা ও বাধা এসেছিল।
বিশেষ করে বিদেশি বা আমদানি করা পারমাণবিক ঘড়িতে মারাত্মক কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় আগের বেশ কয়েকটি উপগ্রহ অকেজো হয়ে পড়েছিল এবং থমকে গিয়েছিল পুরো প্রজেক্ট।
তবে সেই বিদেশনির্ভরতার অন্ধকার যুগ পেছনে ফেলে এবার সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাস রচনা করেছে ভারত। অতীতের সেই বেদনাদায়ক ত্রুটি চিরতরে ঘুচিয়ে দিতে নতুন এই ‘এনভিএস-০৩’ স্যাটেলাইটে সফলভাবে যুক্ত করা হয়েছে একান্তই দেশীয় প্রযুক্তিতে পরীক্ষিত ও তৈরি পারমাণবিক ঘড়ি। এই দুর্দান্ত সাফল্য ভারতকে প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ প্রযুক্তির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্রে পুরোপুরি আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড় চমক হলো, এই নতুন উপগ্রহটিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আধুনিক ‘এল ওয়ান’ বা L1 সিগন্যাল বা সংকেত সফলভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে জটিল বিমান চলাচল ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন আধুনিক পরিবহন খাতে এই দেশীয় নেভিগেশন সিস্টেম খুব সহজেই এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষকদের মতে, একার পক্ষে এই একক ‘এনভিএস-০৩’ স্যাটেলাইট হয়তো রাতারাতি গোটা নেটওয়ার্কের ত্রুটি পুরোপুরি ঠিক করে ফেলতে পারবে না, তবে ভারতের নিজস্ব ও সম্পূর্ণ স্বাধীন নেভিগেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথে এটি একটি ঐতিহাসিক, সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত যুগান্তকারী মাইলফলক।
সান নিউজ / রাজীব