ইউরোপের একের পর এক দেশে বিক্ষোভ-আন্দোলনের ঢেউয়ের মধ্যে এবার জার্মানির বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের প্রতিবাদের প্রস্তুতি চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার পর আগামীকাল শনিবার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় শুরু থেকেই তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। এসব কর্মসূচির কয়েকটিতে সহিংসতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। সেই প্রেক্ষাপটে জার্মানিতেও সম্ভাব্য বিক্ষোভকে ঘিরে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিক্ষোভের উদ্যোগ নিয়েছে নিজেদের ‘জেন-জি’ পরিচয়ে পরিচিত একটি প্ল্যাটফর্ম। তবে এর পেছনে কারা রয়েছেন কিংবা আন্দোলনের নেতৃত্ব কার হাতে, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সংগঠনের যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্যও সম্প্রতি একাধিকবার বদলানো হয়েছে বলে জানা গেছে, যা আন্দোলনটির স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে কয়েক সপ্তাহ ধরে এই কর্মসূচির পক্ষে প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক এই প্রচারণাই মূলত আন্দোলনের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশব্যাপী তরুণদের একত্র করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তবে আন্দোলনের প্রতি সর্বজনীন সমর্থন তৈরি হয়নি। জার্মানির বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন এবং জাতীয় পর্যায়ের ছাত্র প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাগুলোর একটি অংশ এই কর্মসূচি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। তাদের যুক্তি, আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কাঠামো অস্পষ্ট থাকলে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এর পরিবর্তে তারা আগামী নভেম্বরে আলাদা কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য তরুণ সংগঠনের অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনো সামাজিক আন্দোলনের শুরুতে এমন শিথিল ও বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে অনলাইন যোগাযোগ, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এবং সামাজিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা ঘটছে বেশি। পরবর্তীতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব উদ্যোগে নেতৃত্ব, মুখপাত্র এবং সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গড়ে ওঠে।
আন্দোলনকারীরা তাদের ঘোষিত দাবিতে শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার দাবি তুলেছে তারা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার দায় কেবল তরুণ প্রজন্মের কাঁধে চাপানো উচিত নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে তা ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করতে হবে।
এ ছাড়া সামরিক খাতে ব্যয় কমানো, তরুণদের মতামত ছাড়া ভবিষ্যৎ নির্ধারণী সিদ্ধান্ত না নেওয়া, নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন নজরদারি নীতির বিরোধিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিও তাদের কর্মসূচির অংশ।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বহু দেশের তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। বাড়তি জীবনযাত্রার খরচ, শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা, কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ এবং জলবায়ু সংকটের প্রভাব নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় করে তুলছে। ফলে বিভিন্ন দেশে একই ধরনের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অংশ আন্দোলনটিকে আগেভাগে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতার সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, তরুণদের উদ্বেগ ও দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। অন্যথায় ক্ষোভ আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কোনো সম্ভাবনাই একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না। যদিও এখন পর্যন্ত সরাসরি সহিংসতার আহ্বান শনাক্ত হয়নি, তবুও উগ্রপন্থী কিছু গোষ্ঠী এবং বিদেশভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ। সে কারণে শনিবারের কর্মসূচিকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
ইউরোপজুড়ে চলমান বিক্ষোভের আবহে জার্মানির এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের উদাহরণ হবে, নাকি নতুন কোনো উত্তেজনার জন্ম দেবে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের।
সান নিউজ / রাজীব