মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অদম্য সাক্ষী, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি আর আমাদের মাঝে নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ৮৪ বছর বয়সে নিজ বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দীর্ঘ লড়াই আর বার্ধক্যের সঙ্গে যুঝেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন এই সংগ্রামী নারী।
আজ শুক্রবার বেলা তিনটায় উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শেষ বিদায় জানানো হয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এই আয়োজনে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশরাফুল হক এবং সাদুল্লাপুর থানার ওসি (তদন্ত) হাসানুল কবিরসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত থেকে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
ফুলমতির জীবনের পথচলা কখনই সহজ ছিল না। উত্তরপাড়ার প্রয়াত কুশিরাম রবিদাস ফসিয়ারের স্ত্রী ফুলমতি ১৯৮৮ সালে স্বামীকে হারানোর পর চরম দারিদ্র্য ও অভাবের সঙ্গে লড়াই করে চার ছেলে ও এক মেয়েকে বড় করেছিলেন। গত প্রায় দুই বছর আগে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ডান হাত ও পা অবশ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই তিনি বিছানাগত ছিলেন।
১৯৭১ সালের সেই ভয়াল দিনগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা অন্যান্যদের মতো ফুলমতির জীবনেও নেমে এসেছিল গভীর অন্ধকার। গবেষক জহুরুল কাইয়ুমের বর্ণনামতে, একাত্তরে ফুলমতির বাড়িতে হানা দিয়ে পিশাচেরা তাঁর স্বামীর বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁর সামনেই তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। দীর্ঘ লড়াই ও অপেক্ষার পর ২০১৬ সালের মার্চ মাসে তিনি রাষ্টীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান। পরবর্তীতে সরকারের ‘বীরনিবাস’ প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই হয়েছিল।
তাঁর এই প্রয়াণে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সাদুল্লাপুর গার্লস ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও লেখক হোসনে আরা মুন্সি যথার্থই বলেছেন, ফুলমতি কেবল একজন নারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ইতিহাস। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর এই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সান নিউজ/রাজীব