এক নজরে থাইল্যান্ডে ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
▶ মূল কারণ: স্থানীয় ব্যবসা দখল, অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা এবং থাই সংস্কৃতির অবমাননা।
▶ প্রধান দাবি: ফুকেটে বিক্ষোভরত নেতারা ইসরায়েলিদের অন-অ্যারাইভাল ভিসার মেয়াদ ১ মাস থেকে কমিয়ে ১৪ দিন করার এবং সব 'চাবাদ' কেন্দ্র বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
▶ আলোচিত ঘটনা: তদন্তের সময় এক ইসরায়েলি পর্যটকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য— “আপনারা কি জানেন না এটি ইসরায়েলি ভূখণ্ড?”
▶ প্রশাসনের পদক্ষেপ: জালিয়াতির অভিযোগে থাই প্রধানমন্ত্রী চাবাদ প্রধানের নাগরিকত্ব বাতিল করেছেন এবং দেশজুড়ে চাবাদ হাউসের ওপর কঠোর তদন্ত শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় দ্বীপ থাইল্যান্ডের ফুকেট যেন এক অদ্ভুত অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে রূপ নিয়েছে। থাই নাগরিকদের ব্যবসা গ্রাস করা, স্থানীয় আইনকে থোড়াই কেয়ার করা এবং নিজ দেশের পরিমণ্ডলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের গুরুতর অভিযোগে ইসরায়েলি পর্যটকদের বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ ও নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
সপ্তাহান্তে ফুকেট দ্বীপের রাজপথগুলোতে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, যা এখন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের নাড়া দিচ্ছে।
গতকাল সোমবার স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ আরব’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ফুকেট দ্বীপে আয়োজিত ‘নো ইসরায়েল- সেভ ফুকেট’ সম্বলিত বিশাল সব ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা।
এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন থাইল্যান্ডের প্রভাবশালী মিডিয়া মোগল এবং সুপরিচিত ‘ইয়েলো শার্ট’ আন্দোলনের শীর্ষ নেতা সোধি লিমথংকুল। তিনি সর্বসমক্ষে কঠোর অভিযোগ তুলছেন যে, ইসরায়েলি নাগরিকরা ফুকেটের স্থানীয় অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো কেবল নিজেদের দেশের পর্যটকদের সেবা প্রদান নিশ্চিত করা এবং থাই অর্থনীতিকে বাইপাস করে নিজস্ব বলয় তৈরি করা।
একই দিন দ্বীপের অন্য একটি অংশে আরও একটি বড় প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন স্থানীয় নেতা সাইচোল নুচোট। তার কণ্ঠেও ছিল তীব্র অসন্তোষ। তিনি সরাসরি থাই সরকারের নিকট দাবি জানিয়েছেন যে, যেসব ইসরায়েলি নাগরিক অতীতে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেছেন, তাদের সেই নাগরিকত্ব অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
শুধু তাই নয়, থাইল্যান্ডজুড়ে কার্যক্রম চালানো সবকটি ‘চাবাদ’ প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ করারও জোর দাবি তুলেছেন তিনি।
স্থানীয় প্রতিবাদী গোষ্ঠীগুলোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে যে, থাইল্যান্ডে প্রবেশ করে ইসরায়েলিরা দীর্ঘদিন ধরে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আসছে। বৈধ কোনো লাইসেন্স বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তারা গোপনে নানা ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করে চলেছে।
এমনকি বিদেশি মালিকানা সংক্রান্ত কঠোর আইন এবং বিধিমালাগুলো এড়ানোর কূটকৌশল হিসেবে তারা স্থানীয় থাই নাগরিকদের নাম বা পরিচয় ব্যবহার করছে। পাশাপাশি থাই সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে ক্রমাগত অসম্মান করার মতো ঘটনাও ঘটিয়ে চলেছেন তারা।
গত জুলাই মাসে এই অসন্তোষ এক নতুন মাত্রা পায়, যখন থাই সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা ‘চাবাদ হাউস’ নামক ইহুদি কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বিশেষ নজরদারি ও তদন্ত শুরু করেন। সেই তদন্তের সময় এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ ইসরায়েলি পর্যটক সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং ঔদ্ধত্যের সুরে প্রশ্ন তোলে— ‘আপনারা কি জানেন না এটি ইসরায়েলি ভূখণ্ড?’
এই একটি মাত্র ঘটনা থাই প্রশাসনের টনক নড়াতে বাধ্য করে। এরপরই থাইল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের গোয়েন্দা নজরদারি ও তদন্তের পরিধি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে। পরবর্তীতে গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশজুড়ে অন্তত নয়টি সন্দেহভাজন চাবাদ হাউসের লাইসেন্স, কার্যক্রম এবং সম্পত্তির মালিকানা যাচাই করতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহেই থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল দেশের চাবাদ প্রধান রাব্বাই ইউসেফ চাইম কান্টোরের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন।
২০১৩ সালে তাকে থাই নাগরিকত্ব প্রদান করা হলেও, সাম্প্রতিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। থাই নাগরিকত্ব থাকার পরও তিনি অত্যন্ত গোপনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট ব্যবহার করে অন্তত ১৬ বার অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করেছেন, যা দেশটির অভিবাসন আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফলস্বরূপ, তার থাই নাগরিকত্ব তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই মনোরম দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি পর্যটকদের কাছে একটি অন্যতম শীর্ষ ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ইসরায়েলের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বা সেনাসেবা শেষ করার পর তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ অবসাদ কাটাতে থাইল্যান্ডে ছুটে আসেন।
তবে ২০২৩ সালের পর থেকে গাজা যুদ্ধ কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অঙ্গনে ইসরায়েলবিরোধী যে রাজনৈতিক স্রোত তৈরি হয়েছে, থাইল্যান্ডের বর্তমান আন্দোলনগুলো তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে।
এখানে মূল ক্ষোভের কারণ হলো স্থানীয় পর্যটন বাজার পুরোপুরি গ্রাস করে নেওয়ার ইসরায়েলি প্রবণতা এবং জনজীবনের বহুমুখী সংকট। থাই প্রশাসন এখন এই জনরোষ কীভাবে সামাল দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সান নিউজ / রাজীব