-
নতুন মোড় : ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
-
মূল ক্ষেত্রসমূহ : সামুদ্রিক ও সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন।
-
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিপরীত মেরুতে অবস্থান, পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি হওয়া দূরত্ব এবং অভিবাসন নীতির বাধার পেরিয়ে বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকে দুই দেশের সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা আসতে শুরু করে।
-
কাছাকাছি আসার মূল কারণ : ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসন, সাইবার হুমকি, সীমান্ত সংঘাত (যেমন গালওয়ান সংঘাত) এবং মার্কিন নীতিতে তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা।
-
সামরিক মহড়ার বিস্তৃতি : ২০২০ সালের 'সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারি' চুক্তির পর থেকে যৌথ সামরিক তৎপরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দুই দেশ ১৪টি দ্বিপক্ষীয় এবং ৬৪টি ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় মহড়ায় অংশ নিয়েছে।
-
প্রধান যৌথ মহড়াসমূহ: নৌবাহিনীর 'অসইন্ডেক্স' (AUSINDEX)-এ সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ এবং স্থলবাহিনীর 'অস্ত্রাহিন্দ' (ASTRAHIND)-এ ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধ কৌশলের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
-
বর্তমান বাধা ও চ্যালেঞ্জ : নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি, মার্কিন রপ্তানি নীতির কারণে সামরিক বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণে জটিলতা এবং সেনাসদস্যদের দ্রুত ভিসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা।
-
আগামীর সম্ভাবনা : ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি, সাঁজোয়া যান ও চালকবিহীন ডুবোযান (UUV) যৌথভাবে তৈরি এবং পি-৮ নজরদারি বিমানের পারস্পরিক ব্যবহারের মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিকে শক্তিশালী অংশীদারি গড়ে তোলার বড় সুযোগ রয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে চলমান পালাবদলে দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ ঐতিহাসিক দূরত্ব এবং শীতল যুদ্ধকালীন নানা জটিলতা পেছনে ফেলে সময়ের বিবর্তনে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক অস্ট্রেলিয়া সফরে দুই বন্ধুরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারির ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী সমঝোতা হয়েছে, তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসন এবং ওয়াশিংটনের বৈদেশিক নীতিতে সৃষ্ট ধারাবাহিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই দুই আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের নিরাপত্তা বলয় সুদৃঢ় করতে এক অবিচ্ছেদ্য জোটে পরিণত হয়েছে।
একসময় ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত সম্পর্কের পারদ বেশ নিম্নমুখী ছিল। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তপ্ত দিনগুলোতে ক্যানবেরা দৃঢ়ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বলয়ে যুক্ত থাকলেও নয়াদিল্লি তৎকালীন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বজায় রেখে পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সান্নিধ্যে আসে। সেই উত্তাল সময়ে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা যোগাযোগ ভারতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
তাছাড়া ভারতের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির জেরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন কঠোর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে নয়াদিল্লির সামরিক সহযোগিতার পথ চিরতরে রুদ্ধপ্রায় হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন বর্ণবাদী অভিবাসন নীতি বা 'হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া' পলিসির কারণে দুই দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগও ছিল অত্যন্ত সীমিত।
তবে ইতিহাসের সেই বরফ গলতে শুরু করে নতুন শতাব্দীর সূচনালগ্নে। ২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের দিল্লি সফরের হাত ধরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক নতুন গতি আসে। ২০০৪ সালের প্রলয়ঙ্করী সুনামির পরবর্তী সময়ে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ মানবিক ত্রাণ কার্যক্রম ইন্দো-প্যাসিফিক কূটনীতিতে নতুন আশার আলো দেখায়।
যদিও ২০০৭ সালের কোয়াড সংলাপ এবং মালাবার নৌ-মহড়ার মতো ঐতিহাসিক মাইলফলকের পর ভূ-রাজনৈতিক নানা জটিলতা ও ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাময়িক প্রত্যাহার এবং সে দেশে কিছু অনভিপ্রেত জাতিগত ঘটনার কারণে সম্পর্ক সাময়িকভাবে হোঁচট খেয়েছিল, তবুও দুই দেশের নীতিনির্ধারকরা সহযোগিতার বিকল্প পথ খুঁজতে পিছপা হননি।
পরবর্তী সময়ে চীন সাগরে বেইজিংয়ের বেপরোয়া সামরিক তৎপরতা, সাইবার জগতের নানা আক্রমণ এবং ২০১৭ সালের হিমালয়ের ডোকলাম সীমান্তে ভারত-চীন মুখোমুখি সামরিক উত্তেজনার ফলে দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের বোধোদয় ত্বরান্বিত হয়। এরপর ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘাতে ২০ জন ভারতীয় জওয়ানের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা নয়াদিল্লিকে সম্পূর্ণ নতুন এক কৌশলগত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। অন্যদিকে, বাণিজ্য ও সাইবার হামলার জেরে অস্ট্রেলিয়া ও চীনের সম্পর্কেও ফাটল ধরে।
ঠিক এমন স্পর্শকাতর সময়ে হোয়াইট হাউসের নীতিমালায় বারবার পরিবর্তন এবং মার্কিন নেতৃত্বের দূরদর্শিতা নিয়ে তৈরি হওয়া শঙ্কা দুই দেশের সামরিক নীতিনির্ধারকদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর বার্তা দেয়। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাদাভাবে চুক্তি কিংবা অকাস (AUKUS) চুক্তির পাশাপাশি নয়াদিল্লি ও ক্যানবেরা একে অপরের পরিপূরক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে বাধ্য হয়।
গত কয়েক বছরে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং যৌথ মহড়ার পরিধি বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের ঐতিহাসিক 'সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারি' চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের পালে নতুন হাওয়া লেগেছে।
২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, দুই দেশের সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে ১৪টি দ্বিপক্ষীয় এবং ৬৪টিরও বেশি ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় মহড়ায় অংশ নিয়েছে, যা তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক আস্থার প্রতীক।
নৌবাহিনীর বার্ষিক 'অসইন্ডেক্স' (AUSINDEX) মহড়ায় সাবমেরিন ধ্বংস করার অত্যাধুনিক কৌশল থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমানের নিখুঁত ব্যবহার নিয়মিত ঝালাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থলবাহিনীর 'অস্ত্রাহিন্দ' (ASTRAHIND) মহড়ায় আধুনিক ড্রোনের ব্যবহার এবং শত্রু ড্রোন প্রতিহত করার অভিনব ও মারকাটারি কৌশল এখন প্রধান ফোকাস। ২০২৬ সালের নির্ধারিত মহড়াগুলোতে উভচর যুদ্ধ পরিচালনা এবং জটিল উপকূলীয় অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালানোর বিশেষ প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর বাইরে ২০২৪ সালে আকাশপথে চলমান যুদ্ধবিমানে মাঝ আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জটিল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় দুই দেশের বিমানবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
দৃশ্যমান বিপুল সম্ভাবনার পরেও ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার এই অংশীদারির পথে বেশ কিছু কাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এখনও কাঁটার মতো বিঁধে আছে। দুই দেশের সামরিক কাঠামোর ভেতরে নিখুঁত সমন্বয়ের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি ও স্পর্শকাতর যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সামরিক হার্ডওয়্যারের রক্ষণাবেক্ষণে নানামুখী আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহযোগিতার গতি কিছুটা হলেও মন্থর করে দিচ্ছে।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া সরাসরি মার্কিন প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হওয়ায় ভারতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে ডেটা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে মাঝেমধ্যেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়। তাছাড়া ওয়াশিংটনের কঠোর সব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের বেড়াজালে পড়ে মার্কিন নির্মিত সামরিক বিমানের জরুরি খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ ও দ্রুত মেরামতের কাজও অনেক সময় থমকে যায়।
সবচেয়ে বড় কথা, দুই দেশের সেনাসদস্য, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের যৌথ মহড়া বা গবেষণা কার্যক্রমে অংশ নিতে প্রয়োজনীয় ভিসা দ্রুত প্রাপ্তির পথটি এখনো যথেষ্ট জটিল ও দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ।
বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই দুই শক্তিকে অচিরেই বর্তমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক চাহিদা মেটাতে দুই দেশের প্রতিরক্ষাবিদেরা এখন যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পি-৮ গোয়েন্দা নজরদারি বিমানের পারস্পরিক ও যৌথ ব্যবহার, এবং সাবমেরিন ও ভারী নৌযান মেরামতে একে অপরের ডকইয়ার্ড ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত করার প্রস্তাব টেবিলে রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ড্রোন প্রতিহত করার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী সাঁজোয়া যান এবং চালকবিহীন সাবমার্সিবল বা ডুবোযান (UUV) তৈরিতে যৌথ গবেষণাগার গড়ে তোলার মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিকের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং অপ্রতিরোধ্য অক্ষ গড়ে তোলার বিশাল সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে।
সান নিউজ / রাজীব