শিল্প ও সাহিত্য

খুশির এক টুকরো আলো

​লেখিকা: তিথি

চন্দ্রিমা উদ্যানের বিকেল ​দিনটা ছিল আর দশটা দিনের মতোই সাধারণ। এক বিকেলে একা একা মনটা কেমন যেন করছিল, তাই নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঘুরতে গেলাম চন্দ্রিমা উদ্যানে। পার্কের পাশে রাস্তা ঘেঁষে গাড়িটা বামে চাপিয়ে রাখলাম। হঠাৎ করেই ফুচকা খাওয়ার খুব ইচ্ছে হলো, তাই গাড়ি থেকে নেমে ফুচকার অর্ডার দিলাম।

​ফুচকা তৈরি হতে হতে আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশটা দেখছিলাম। চারদিকের সবুজ গাছপালা আর বিকেলের হালকা মিষ্টি বাতাস মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিচ্ছিল। একা একা ঘুরতে আসলেও একটুও খারাপ লাগছিল না, বরং প্রকৃতির এই পরিবেশটা বেশ উপভোগ করছিলাম। এমন সময় চটপটি বিক্রেতা প্লেটটা হাতে নিয়ে বেশ আদর করে বলল, "ম্যাডাম, এই নিন আপনার ফুচকা।"
​আমি এক কোণে বসে একা একা ফুচকা খাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই কোথা থেকে এক ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। তার হাতে ফুলের মালা। মেয়েটি মায়াবী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, "আপা, ফুল কিনবেন, ফুল?"
​আমি মেয়েটির দিকে তাকালাম। তার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আমার খুব মায়া লাগল। আমি বললাম, "দাঁড়াও, নিব।"
​কথাটা বলে আমি আবার ফুচকা খেতে লাগলাম। কিন্তু মেয়েটি ওখানেই দাঁড়িয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে আমার ফুচকা খাওয়া দেখছিল। ওর তাকানো দেখে আমার মনে হলো ও হয়তো ক্ষুধার্ত। আমি হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করলাম, "ফুচকা খাবে?"
​মেয়েটি চটপট উত্তর দিল, "দিলে খামু, আর না দিলে খামুনা।"


​ওর এমন সহজ আর স্পষ্ট কথা শুনে আমার মুখে জোরে একটা হাসি চলে এলো। আমি হেসে ফেলে বললাম, "বাহ্‌! দিলে খাবে আর না দিলে খাবে না!"
​আমি প্লেট থেকে একটা ফুচকা ওর হাতে তুলে দিলাম। মেয়েটি বেশ আনন্দ নিয়ে ওটা খেল। খাওয়া শেষ হতেই ও আবার জিজ্ঞেস করল, "আপা, ফুল কিনবেন না?"
​আমি অভয় দিয়ে বললাম, "নিব তো, তুমি একটু দাঁড়াও। আমি আগে খেয়ে নেই।"
​আমি ওকে আরও একটা ফুচকা দিলাম। ওটাও ও বেশ তৃপ্তি করে খেল। কিন্তু খাওয়া শেষ করেই আবারও একই প্রশ্ন, "আপা, ফুল নিবেন না?"
​এবার আমি একটু ভালোবেসে ওকে বললাম, "একবার যখন বলেছি নিব, তারপর আর কোনো কথা আছে মা? তুমি একটু দাঁড়াও।"
​পরে ওর মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগল। আসলে ও মনে মনে ভয় পাচ্ছিল—আমি যদি ওকে ফুচকা খাইয়ে শেষ পর্যন্ত ফুল না কিনে চলে যাই! ছোট্ট মনের এক অদ্ভুত ভয়।

​ খুশির জীবনের গল্প
​ফুচকা খাওয়া শেষ করে আমি ফুচকার বিল দিয়ে দিলাম। তারপর ফুল বিক্রেতা মেয়েটিকে ডেকে বললাম, "তোমার ফুলের মালার দাম কত?"
​ও বলল, "২০ টাকা।"
​আমি ব্যাগ থেকে একটা ৫০ টাকার একটা নোট বের করে ওর হাতে দিলাম। মেয়েটি নোটটা হাতে নিয়ে বলল, "আপা, আমার কাছে তো টাকা ভাংতি নেই।"

​আমি হেসে বললাম, "তোমাকে ফেরত দিতে হবে না, তুমি পুরো টাকাটা নিয়ে যাও।"
​২০ টাকার জায়গায় একবারে ৫০ টাকা পেয়ে মেয়েটার মুখে যে কী আকাশছোঁয়া খুশি ফুটে উঠল, তা দেখার মতো ছিল। ওর সেই আনন্দ দেখে আমার মনে মেয়েটার প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা জেগে উঠল। আমি পরম স্নেহে জিজ্ঞেস করলাম, "তোমার নাম কী?"
​মেয়েটি একটু অবাক হয়ে বলল, "আপা, আমার নাম দিয়ে কী করবেন?"
​আমি হেসে দিয়ে বললাম, "কিছু করব না রে। তুমি ফুল বিক্রি করছ দেখে তোমার নামটা জানতে ইচ্ছে হলো।"
​ও তখন বলল, "ও আচ্ছা! আমার নাম খুশি।"
​"খুশি। তুমি ফুল বিক্রি করছ কেন?"
​খুশির মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল। ও বলল, "ফুল বিক্রি না করলে কী খাবো আপা?"
​"কেন? তোমার বাবা-মা নেই?"

​খুশি তখন বলল, "বাসায় আমার মা আর একটা ছোট বোন আছে। মায়ের শরীরটা খুব খারাপ, ভালো না। তাই আমি সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফুল বিক্রি করি। যা পাই, তা দিয়ে কিছু খাবার কিনে বাসায় নিয়ে যাই। তারপর মা আর ছোট বোনকে নিয়ে একসাথে খাই।"

​ছোট্ট খুশির মুখের এই কথাগুলো শুনে সত্যি মনটা এত খারাপ হলো যে তা বলার মতো না। এতটুকু একটা বাচ্চা, যার এখন স্কুলে যাওয়ার কথা, সে পুরো সংসারের দায়িত্ব নিয়ে ঘুরছে। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ওকে বললাম, "খুশি, তুমি আমার সাথে আমার বাসায় থাকবে? তোমাকে আমি খুব ভালো ভালো খেতে দিব।"

​আমার কথা শুনে খুশি আমার দিকে তাকাল। ওর উত্তরটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। ও বলল, "আপা, আমি ভালো ভালো খামু, আর আমার মা বোন কি খেয়ে থাকবে?"

​আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, এত ছোট একটা মেয়ে, কিন্তু তার কত বড় চিন্তা। আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম, "তুমি আমার বাসায় থাকলে আমি তোমাকে টাকা দিব। সেই টাকা তুমি তোমার মাকে দিয়ে দিও। ফুল বিক্রি করে তুমি আর কয় টাকাই বা পাও তাতে কি, তোমার আর তোমার মা বোনের তিন বেলার খাবার জোটে বলো? তার থেকে ভালো তুমি আমার কাছে থাকবে, আর আমি নিজে প্রতি মাসে গিয়ে তোমার মাকে কিছু টাকা দিয়ে আসব। কি বল খুশি, থাকবে?"

​খুশি একটু চিন্তা করে বলল, "আপা, আমার মার সাথে একটু কথা বলে নাই। আমার মা কি বলে দেখি।"
​আমি বললাম, "ঠিক আছে। তোমার মার কাছে আমাকে নিয়ে যাবে?"
​খুশি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "আপা, আপনি আমার মার কাছে কেন যাবেন?"
​"কেন আবার? তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাব, তাই তোমার মার সাথে দেখা করব।"
​আমার কথা শুনে মেয়েটা একটু ভয় পেয়ে গেল। ওর চেহারা দেখে আমি বুঝতে পারলাম ও ভয় পাচ্ছে। তখন আমি বললাম, "তুমি কি ভয় পেয়েছ? তুমি কি কোনো দোষ করেছ?"
​ও বলল, "না।"
​আমি বললাম, "আমি তোমার মা আর বোনের উপকার করার জন্যই তোমার মার সাথে দেখা করব।"


​কথাটা শোনার সাথে সাথে খুশি আবারও সুন্দর করে একটা হাসি দিল। ওর সেই হাসি দেখে খুব ভালো লাগল। মেয়েটির সাথে কথা বলে আমার অনেক মায়া লেগেছিল।
​মনে মনে ভাবলাম, এই ছোট্ট মেয়েটি নিজের মা আর বোনের খাবারের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফুল বিক্রি করছে। অথচ আজকাল কত বড়লোকের কত টাকা কত দিকে নষ্ট হচ্ছে। নিজেদের মা, ভাই বা বোনের অভাব দেখলেও অনেকে ফিরে তাকায় না। যাক, পরের কথা চিন্তা করে আমার কোনো দরকার নেই। ছোট মেয়ে খুশিকে দেখে আমার মধ্যে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছিল। আর বারবার মনে হচ্ছিল, আমি আজ যদি ওর জায়গায় থাকতাম, তবে কী হতো? কেন জানি এমন মনে হচ্ছিল। তাই চিন্তা করে দেখলাম, এই ছোট্ট মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করতে পারলে নিজেকে অনেক ধন্য মনে করব।

এক নতুন আশ্রয়ের সূচনা।
​আমি খুশির সাথে ওদের বাসায় গেলাম। খুশির মার সাথে দেখা করে সব কিছু বলার পর, তার মা বলল, "ম্যাডাম, আপনার বাসাটা আমাকে একটু চিনিয়ে দিবেন? আমার যখন ইচ্ছে করবে খুশিকে দেখতে, তখন একটু গিয়ে দেখে আসব।"
​আমি তখন বললাম, "অবশ্যই তুমি তোমার মেয়েকে মাঝে মধ্যে দেখে আসবে আর মাসের খরচের টাকাটাও এসে নিয়ে যাবে।"
​তারপরে আমি ব্যাগ থেকে ১০০০ টাকার একটি নোট খুশির মার হাতে দিলাম। এতগুলো টাকা পেয়ে খুশির মা বেশ খুশি হলো। আর আমাকে বলল, "আপনার জন্য আমি অনেক দোয়া করি ম্যাডাম।"
​আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, "খুশির বাবা কোথায়?"
​খুশির মা বলল, "ওই ব্যাটা তো আরেকটা বিয়ে করে আমাদেরকে এই কষ্টের মধ্যে ফেলে চলে গেছে।"
​সব শুনে আমি খুশির মাকে আমার গাড়িতে উঠিয়ে নিলাম এবং আমার বাসাটা ভালো করে চিনিয়ে দিলাম।
​খুশির মা যখন খুশিকে রেখে চলে যাচ্ছিল, তখন তার মা খুশিকে বলল, "ভালো করে থাকিস। তোর কপাল ভালো যে এমন একজন ভালো মানুষকে পেয়েছিস।"

​তারপরে খুশির মা বলল, "ম্যাডাম, এবার আমি যাই।"
​তখন আবারও আমি খুশির মাকে ৫০ টাকা দিয়ে বললাম, "তুমি রিকশা দিয়ে যাবে, কেমন।"

​টাকাটা পেয়ে খুশির মার চোখে পানি জ্বলজ্বল করছিল। ওনার সেই চোখের পানি দেখে আমি আর আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না। কিছু নীরবতা বোধহয় সব কথাই বলে দেয়। খুশির জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে আমি খুশির কাহিনি এখানেই শেষ করলাম।

​লেখিকা ও সমাজকর্মী

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে নিউইয়র্কের উ...

ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে নিউমার্কেট, ব্যাহত যান চলাচল

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারী বৃষ্টিতে নিউমার্কেট ও আশপাশে...

বাংলাদেশ–ইউনান বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক...

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

ইংল্যান্ড দল থেকে সরে দাঁড়ালেন কোল পালমার

ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলে ফের ডাক পেলেও ইনজুরির কারণে স্কোয়াড থেকে সরে দাঁড়াচ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা