টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও কারখানায় ছুটি ঘোষণার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন। ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ (ডিইপিজেড) বিভিন্ন কারখানায় শুরু হয়েছে উৎপাদন কার্যক্রম। তবে গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে আশুলিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্ন উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিল্পাঞ্চলের ৭০টি কারখানায় বৃহস্পতিবারের জন্য সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি মোতায়েন রয়েছে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি। নয়জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও চলছে।
সকাল থেকেই সাভার, আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে দেখা যায়। কেউ কারখানার নিজস্ব পরিবহনে, আবার কেউ পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে আসেন। ডিইপিজেডসহ অধিকাংশ কারখানার সামনে শ্রমিকদের স্বাভাবিক উপস্থিতি ছিল। তবে নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর, জামগড়া, সরকার মার্কেট, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ কয়েকটি এলাকার কারখানায় শ্রমিকেরা সকালে প্রবেশ করলেও পরে উৎপাদন কার্যক্রমে অংশ না নিয়ে বেরিয়ে আসেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষে আহত হয়ে পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক মিছিলে অংশ নেন। মিছিলটি জিরাবো থেকে শুরু হয়ে ঘোষবাগ, নরসিংহপুর ও সরকার মার্কেট ঘুরে বেরন এলাকার এনভয় গার্মেন্টসের সামনে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জামগড়া এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ না করে বাইরে বেরিয়ে আসেন। একপর্যায়ে তাঁরা আশপাশের কারখানার শ্রমিকদেরও কাজে যোগ না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিক্ষোভকারীদের হামলায় পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, তাঁদের আওতাধীন ১ হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে ৭০টি বৃহস্পতিবার সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে উৎপাদন চলছে। তিনি বলেন, গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে জিরাবো এলাকায় দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক শান্তিপূর্ণ মিছিল করেছেন। তবে জামগড়ায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের ঘিরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকেরা কাজ করতে চান। তবে বহিরাগত দুষ্কৃতিকারীরা বিভিন্নভাবে তাঁদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং এ বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে সাভার ও আশুলিয়ায় এ পর্যন্ত আটটি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। বৃহস্পতিবার বিকেলে সাভারের আল-মুসলিম গার্মেন্টস পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সাভার মডেল থানায় দুটি এবং আশুলিয়া থানায় ছয়টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
এ সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শ্রমিকেরা বর্তমানে আন্দোলনে নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কিছু ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। যারা শিল্পকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে, এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, তারা একটি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী গ্রুপ। এছাড়া গত কয়েক দিনের আন্দোলনে উস্কানির অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা কেউই শ্রমিক নয়। তারা বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এসেছে।
সাননউিজ/বান্না