প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট হলো সংখ্যার হিসাব, তবু ক্ষমতার পথ কণ্টকমুক্ত নয়। আরব দলগুলোকে নিয়ে অস্বস্তিতে বিরোধী শিবিরের তিন ইহুদি দল, ওদিকে নেতানিয়াহুকে ছেড়ে সরে দাঁড়াল জোটসঙ্গী ইউটিজে
ইসরায়েলের রাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ নতুন করে বদলে যাচ্ছে। বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকটকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন জানিয়েছে দেশটির আরব রাজনৈতিক দলগুলো। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে বৈঠকে দলগুলোর প্রতিনিধিরা এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। এর ফলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা এখন আইজেনকটের পক্ষে। তবে আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গড়ার প্রশ্নে তাঁর সম্ভাব্য জোটের কয়েকটি ইহুদি দলের আপত্তি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
৬৭–৪৬: সংখ্যার লড়াইয়ে এগিয়ে আইজেনকট
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাদা বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট হারজগ জানান, মোট ৬৭ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দল আইজেনকটের নাম প্রস্তাব করেছে। বিপরীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে মাত্র ৪৬ জনের দল। ব্যবধান বেশ বড় হলেও হারজগ তাৎক্ষণিকভাবে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাননি। তিনি জানিয়েছেন, আরও কিছু আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেবেন, যা আসতে পারে আগামী রোববারই।
"২০১৫ সালের পর এমন সমর্থন কেউ পায়নি"
আইজেনকটের দল ইয়াশার অবশ্য অপেক্ষা করতে নারাজ। তারা প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। দলটির দাবি, গত প্রায় এক দশকে প্রধানমন্ত্রী পদের কোনো প্রার্থীই এত বিপুল সংখ্যক আইনপ্রণেতার সমর্থন পাননি।
বিরোধী শিবিরের ভেতরের ফাটল
কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকলেও বাস্তব হিসাব এত সরল নয়। নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ইহুদি নেতৃত্বাধীন চারটি দল, যাদের মোট আসন ৪৮। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল ও জোটের হাতে আছে ১৯টি আসন। সবাই আইজেনকটের নামে একমত হলেও ইহুদি দলগুলোর মধ্যে তিনটি এখনো আরব দলগুলোর সঙ্গে এক মন্ত্রিসভায় বসতে রাজি নয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সেটিকে স্থিতিশীল সরকারে রূপ দেওয়া নিয়েই এখন প্রশ্ন।
আব্বাসের বার্তা: "আগের সরকারের খারাপ দিনও এর চেয়ে ভালো ছিল"
আইজেনকটকে সমর্থনকারী আরব দলগুলোর মধ্যে রয়েছে রাআম ও জয়েন্ট লিস্ট। রাআমের নেতা মনসুর আব্বাস প্রেসিডেন্টকে জানান, আইজেনকটের নেতৃত্বে একটি কার্যকর সরকার দেখতে চান তাঁরা। ২০২১ সালে ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের গঠিত জোট সরকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের মানদণ্ডে সেই সরকারের দুর্বলতম সময়ও বর্তমান কট্টর ডানপন্থী সরকারের চেয়ে ভালো ছিল।
হামাস প্রশ্নে সূক্ষ্ম কূটনীতি
আইজেনকটের সরকারে যোগ দিতে হলে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্ত রয়েছে। আব্বাস সরাসরি সেই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেননি। তবে সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে তিনি হামাসকে নিরস্ত্র করে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানান। নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো সরকারের পদক্ষেপে রাআম বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলেও তিনি আশ্বাস দেন। তার মতে, রাআমের উপস্থিতি সরকারের নিরাপত্তা-সক্ষমতাকে দুর্বল করবে, এমন ধারণা ভিত্তিহীন।
জয়েন্ট লিস্টের ইঙ্গিত: বাইরে থেকে সমর্থন
জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন বলেন, বর্ণবাদ, বৈষম্য, অপরাধ ও রাজনৈতিক অবহেলায় জর্জরিত আরব নাগরিকেরা পরিবর্তন চান। আইজেনকটের সঙ্গে নানা বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় তাকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলটির আইনপ্রণেতা আহমেদ তিবি আরও এগিয়ে জানান, সরাসরি সরকারে না গিয়ে বাইরে থেকে সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দেওয়ার পথও খোলা আছে। তবে স্বল্পকালের জন্য সরকার টিকিয়ে রেখে তারপর পতন ঘটানোর খেলায় তারা নেই বলেও স্পষ্ট করেন। আগামী নেসেটে জয়েন্ট লিস্টের ১১টি আসন থাকবে উল্লেখ করে তিনি মনে করিয়ে দেন, তাদের সমর্থন ছাড়া সংসদে কোনো বড় উদ্যোগ এগোনো কঠিন হবে।
নেতানিয়াহুর ঘরে আগুন: ইউটিজের মুখ ফেরানো
নেতানিয়াহুর জন্য আরেক দুঃসংবাদ এসেছে নিজের শিবির থেকেই। গত নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেলেও সাত আসনধারী জোটসঙ্গী ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দেয়নি। এতে তার পক্ষে সরকার গড়ার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়েছে এবং আইজেনকটের সামনে নতুন সমীকরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সামনে কী
আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের প্রথম অধিবেশন বসার কথা। এরপরই নির্বাচিত হবেন নতুন স্পিকার। এদিকে ইয়াশার নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছে। দলটির নেতাদের বক্তব্য, ইসরায়েলের এখন প্রয়োজন নতুন নেতৃত্ব ও স্থিতিশীল সরকার। এখন নজর রোববারের দিকে, যেদিন প্রেসিডেন্ট হারজগ জানাতে পারেন সরকার গঠনের চাবি শেষ পর্যন্ত কার হাতে তুলে দেওয়া হবে।
সান নিউজ / রাজীব