╔════════════════════════════════════╗ ║ 🔴 এক নজরে ║ ║ উত্তরাজুড়ে চীনাদের রহস্যময় লাইভ ║ ╚════════════════════════════════════╝
┃ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লাইভ ভিডিও
┃ কেন্দ্রবিন্দু: উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর ও টেকপাড়া
┃ স্থানীয়দের দাবি, দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক সক্রিয়
┃ প্রত্যেকের হাতে দুটি মোবাইল ফোন
┃ সম্প্রচার হয় চীনা প্ল্যাটফর্মে
┃ অভিযোগ, অনেক সময় বাসাবাড়ির কাছেও ভিডিও ধারণ
┃ স্থানীয়দের প্রশ্ন: আসল উদ্দেশ্য কী?
┃ গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
┃ কিছু লাইভে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগ
┃ দীর্ঘদিন চললেও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
কেন আলোচনা?
▪ মাসের পর মাস একই এলাকায় নিয়মিত লাইভ সম্প্রচার
▪ স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাপনকে কনটেন্ট হিসেবে ব্যবহার
▪ কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন দেশের পরিচয় দিয়ে প্রচারের অভিযোগ
▪ সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ নিয়ে ক্ষোভ
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
স্থানীয়দের প্রধান অভিযোগ
▪ অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ
▪ আবাসিক এলাকায় অতিরিক্ত ঘোরাফেরা
▪ ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা
▪ কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তদারকির অভাব
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
বড় প্রশ্ন
উত্তরার অলিগলিতে ধারণ করা এসব লাইভ ভিডিও শেষ পর্যন্ত কার জন্য, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে প্রচার করা হচ্ছে?
ঢাকার উত্তরার অলিগলি, খালপাড়, বসতিপূর্ণ নিম্ন আয়ের মহল্লা কিংবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন। এসব দৃশ্য নিয়ে মাসের পর মাস ধরে লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করছেন একদল চীনা নাগরিক। এইসব চীনাদের হাতে থাকে দুটি মোবাইল ফোন। একটি ফোনে সরাসরি সম্প্রচার চলতে থাকে, অন্যটিতে থাকে বিভিন্ন লেখা বা তথ্য। প্রথম দেখায় অনেকের কাছে বিষয়টি সাংবাদিকতা কিংবা কোনো ডিজিটাল ম্যাপিং প্রকল্পের অংশ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কার্যক্রম চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে এখন কৌতূহলের জায়গা দখল করেছে উদ্বেগ, বিরক্তি ও নানা প্রশ্ন।
উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর, টেকপাড়া এবং আশপাশের কিছু এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দেখা যায় এসব বিদেশি নাগরিককে। বাসিন্দাদের দাবি, দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক নিয়মিত বিভিন্ন গলি, সড়ক, দোকানপাট, খোলা জায়গা এবং আবাসিক এলাকায় ঘুরে ঘুরে এমন ভিডিও ধারণ করেন। কিন্তু সেই ভিডিও কোথায় সম্প্রচার হয়, কী উদ্দেশ্যে করা হয় কিংবা ভিডিওতে কী বলা হয়, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই।
স্থানীয়রা জানান, দিনের শুরুতেই ভিডিও ধারণ শুরু করেন তাঁরা। অনেক সময় রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত একই কার্যক্রম চলে। দীর্ঘদিন ধরে এ দৃশ্য দেখতে দেখতে অনেকেই বিষয়টিকে অস্বাভাবিক মনে করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদেশি নাগরিকেরা প্রায়ই মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরের কাছাকাছি চলে যান এবং অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন স্থান ধারণ করেন।
একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তরার অন্যান্য এলাকার তুলনায় টেকপাড়া এলাকায় এসব ভিডিও ধারণ তুলনামূলক বেশি হয়। জনবহুল এবং নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসস্থল হওয়ায় এলাকাটিকে তাঁরা বিশেষভাবে বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা স্থানীয়দের। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ঘরবাড়ি, দোকানঘর এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডই যেন তাদের সম্প্রচারের প্রধান বিষয়বস্তু।
চীনা নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে বেশির ভাগই কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ নিজেদের নাম বা দেশের পরিচয় দিলেও তাদের কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে চাননি। ভাষাগত সমস্যাও যোগাযোগের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে কয়েকজন স্থানীয় সহযোগীর মাধ্যমে জানা যায়, এসব ভিডিও মূলত বিভিন্ন চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। স্থানীয় গাইড হিসেবে কাজ করা কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক জানান, তাঁরা দৈনিক পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে এসব বিদেশি নাগরিককে সহায়তা করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের জনপ্রিয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব ভিডিও প্রচার করা হয় এবং সেখান থেকে আয়ও করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, লাইভ সম্প্রচারের সময় চীনা ভাষায় বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করা হয়। অনুবাদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু সম্প্রচারে উত্তরার দৃশ্য দেখানো হলেও সেটিকে অন্য দেশের শহর বা এলাকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোথাও স্থানীয় জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত দরিদ্র, অপরিচ্ছন্ন বা অনুন্নত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান ও সামাজিক জীবন নিয়েও অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবশ্য সব সম্প্রচারে নেতিবাচক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কিছু লাইভে বাংলাদেশে চীনা পণ্যের জনপ্রিয়তা, নগরায়ণ কিংবা আধুনিক স্থাপনার বিষয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা গেছে। তবে এমন উদাহরণ সংখ্যায় কম বলেই জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় ধারণ করা একাধিক লাইভ সম্প্রচারের বিষয়বস্তু পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত অবস্থান গোপন রেখে দর্শকদের কাছে ভিন্ন পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে। সম্প্রচারগুলোর কয়েকটিতে উত্তরার টেকপাড়া ও আশপাশের এলাকার দৃশ্য দেখানো হলেও সেটিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। শুধু ভৌগোলিক পরিচয় বদলেই সীমাবদ্ধ থাকেননি কেউ কেউ; স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, বসতবাড়ি ও পরিবেশকে ভারতের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করতেও দেখা গেছে।
এ ধরনের সম্প্রচার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, কেন বাংলাদেশের একটি এলাকার দৃশ্যকে বারবার ভারতের পরিচয়ে প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টি কেবল দর্শক বিভ্রান্তির নয়, বরং একটি দেশের সামাজিক বাস্তবতাকে অন্য দেশের খাতায় তুলে ধরার প্রচেষ্টাও কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে বিভিন্ন মহলে। এতে করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়টি শুধূ নয় সেই সাথে ভারতকেও হেয় করা হচ্ছে।
সমালোচনার মুখে ‘দারিদ্র্যকে পণ্য বানানো’ :
পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি কোনো সম্প্রচারে একটি দেশের বাস্তবতা বিকৃত করে অন্য দেশের পরিচয়ে উপস্থাপন করা হয় কিংবা দরিদ্র মানুষের জীবনকে কনটেন্ট তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, বাসস্থান ও সামাজিক বাস্তবতাকে অনুমতি ছাড়াই ক্যামেরাবন্দী করে সেটিকে বিনোদন কিংবা বাণিজ্যিক উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা গোপনীয়তা ও মর্যাদার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগও মূলত এখানেই। স্থানীয়দের ভাষায়, তাঁরা কোনো প্রদর্শনীর বস্তু নন; অথচ দিনের পর দিন তাদের জীবনযাপনকে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।
এদিকে কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ভিডিও ধারণের সময় কিছু বিদেশি নাগরিক ঘরের আঙিনা, আবাসিক ভবনের প্রবেশপথ এমনকি ব্যক্তিগত ব্যবহারের স্থানেও ঢুকে পড়েন। এতে পরিবারগুলো অস্বস্তিতে পড়ে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এমন কার্যক্রম চললেও এর উদ্দেশ্য, পরিধি কিংবা বৈধতা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য স্থানীয়দের কাছে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিষয়টি সম্পর্কে সীমিত তথ্য জানেন বলে জানিয়েছেন। ভাষাগত বাধা এবং কার্যক্রমের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাবের কারণে বিষয়টি নিয়ে কার্যকর অনুসন্ধানও দৃশ্যমান নয়।
ফলে উত্তরার অনেক বাসিন্দার প্রশ্ন একটাই, দিনের পর দিন তাদের জীবনকে কেন্দ্র করে এই ধরনের রহস্যজনক লাইভ সম্প্রচার আসলে কেন? কারা দেখছে এসব ভিডিও? এবং বাংলাদেশের একটি এলাকার বাস্তব চিত্র যদি অন্য পরিচয়ে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়, তবে এর পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্যই বা কী? উত্তরহীন এই প্রশ্নগুলোই এখন উত্তরার অলিগলিতে সবচেয়ে বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সান নিউজ / রাজীব