-
ফলাফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটে পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ল স্বাগতিকরা।
-
লক্ষ্য ও সফল রান তাড়া: চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য ছিল ১৭০ রান। তারা মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে সহজেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়।
-
ব্যাটসম্যানদের নৈপুণ্য: ক্যারিবীয়দের পক্ষে ওপেনিং জুটিতে ব্রেন্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেলের ১১২ রানের দুর্দান্ত জুটিই ম্যাচের ভাগ্য একপ্রকার নিশ্চিত করে দেয়।
-
বোলারদের পারফরম্যান্স: বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে জোমেল ওয়ারিকান ৫ উইকেট নিলেও, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে মাত্র ১৪২ রানে গুটিয়ে দেন রোস্টন চেজ (যিনি এই ইনিংসে টেস্ট ক্রিকেটে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন)।
-
সমালোচনা ও হতাশা: ঘরের মাঠে স্পিন-বান্ধব পিচ তৈরি করে নিজেদের ফাঁদেই বাংলাদেশ দল ফেঁসে গেছে বলে ক্রিকেট মহলে তীব্র সমালোচনা ও হতাশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
মিরপুরের চেনা উইকেটে ঘূর্ণির ফাঁদ পেতে নিজেরা নিজেদের জালেই আটকে গেল বাংলাদেশ দল। টেস্ট ক্রিকেটের চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়ায় যে পাহাড়সম চাপ থাকে, তাকে পাত্তাই দিল না ওয়েস্ট ইন্ডিজ। স্বাগতিক বোলারদের সমস্ত পরিকল্পনা ও কৌশলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মিরপুর টেস্টে ৮ উইকেটের এক দাপুটে ও ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে সফরকারী ক্যারিবীয়রা। এই চোখ জুড়ানো জয়ের সুবাদে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
গত ২৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই রোমাঞ্চকর টেস্ট ম্যাচের পুরোটা জুড়েই ছিল নাটকীয়তা। প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ দল সব উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করেছিল ২৭2 রান। এর জবাবে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে থামে ২৪৫ রানে। স্বাগতিকরা ২৭ রানের অল্পসল্প লিড পেলেও ম্যাচে চালকের আসনে কখনোই বসতে পারেনি। বিশেষ করে ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যারিবীয় স্পিনারদের মায়াবী ঘূর্ণির সামনে রীতিমতো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ।
প্রথম ইনিংসে জোমেল ওয়ারিকানের ৫ উইকেটের পতন ঘটানোর ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে বিভীষিকা হয়ে ওঠেন রোস্টন চেজ। মাত্র ৩৬ রান খরচ করে একে একে ৫টি উইকেট শিকার করেন এই ক্যারিবীয় অলরাউন্ডার।
শুধু বোলিং পণ্ডিত্যই নয়, এই ইনিংসে বল হাতে নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের উইকেটের শতক বা ১০০ উইকেটের দারুণ মাইলফলকও স্পর্শ করেন তিনি। ফলস্বরূপ, মাত্র ১৪২ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস, যা ম্যাচের ভাগ্য একপ্রকার নির্ধারিত করে দেয়।
জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৭০ রান। চতুর্থ ইনিংসে এই মাঝারি রান তাড়া করতে নেমে বিন্দু পরিমাণ স্নায়ুচাপে ভুগতে দেখা যায়নি ক্যারিবীয় ব্যাটারদের। বিশেষ করে উদ্বোধনী জুটিতে ব্রেন্ডন কিং এবং জন ক্যাম্পবেলের দানবীয় ও দায়িত্বশীল ১১২ রানের জুটি সব ধরনের শঙ্কা উড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ দলের বোলারদের জন্য ম্যাচটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর বা কামব্যাক করার ন্যূনতম কোনো সুযোগ রাখেনি এই জুটি।

ম্যাচের শেষ দিনে জয়ের বাকি পথটুকু দারুণ মুন্সিয়ানার সঙ্গেই পাড়ি দেয় সফরকারীরা। ইনিংসের ৩৫.১ ওভারে স্পিনার তাইজুল ইসলামের করা বলটি মিড-অফের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন ব্রেন্ডন কিং। এর মধ্য দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের লড়াকু মানসিকতার আরও একটি দুর্দান্ত নজির স্থাপিত হলো।
সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের বাইরে ক্রিকেট বোর্ডের নানা আর্থিক অনটন ও সংকটের গুঞ্জন থাকলেও মাঠে তার কোনো প্রভাব পড়তে দেয়নি দলটি। এর আগে ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষেও তারা ওয়ানডে সিরিজে দুর্দান্ত লড়াই করেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হেরেছিল। কিন্তু প্রতিকূলতাকে জয় করে তাদের এই ঘুরে দাঁড়ানো সত্যিই ক্রিকেট বিশ্বে প্রশংসার দাবিদার।
এদিকে ঘরের মাঠে এমন লজ্জাজনক পরাজয়ের পর থেকেই দেশের ক্রিকেট মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও চরম হতাশা। ক্রিকেটপ্রেমী ও বিশ্লেষক মহলে অনেকেই এই হারের জন্য ভুল টিম কম্বিনেশন ও পিচ নির্বাচনকে দায়ী করছেন।
যেমন ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজীব নামের এক ক্রিকেট অনুরাগী বলেছেন, "বাংলাদেশ ক্রিকেটে বর্তমানে দেশের ইতিহাসের সেরা পেস আক্রমণ রয়েছে, অথচ তারা ঘরের মাঠে এমন স্পিন-বান্ধব পিচ বানাল, যেখানে তাদের নিজেদের বর্তমান স্পিন আক্রমণই হয়তো দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল!"
সত্যি বলতে, স্পিড ও পেসের যুগে স্পিন উইকেটের সুবিধা নিতে গিয়ে নিজেদের তৈরি ফাঁদেই যেন ঘরের মাঠে ফেঁসে গেল বাংলাদেশ দল। ব্যাটারদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং বোলারদের বিবর্ণ পারফরম্যান্স বাংলাদেশকে ফের হারের স্বাদ উপহার দিল। এখন দেখার বিষয়, সিরিজের পরবর্তী ও শেষ ম্যাচে টাইগাররা সব ভুল শুধরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না, নাকি ক্যারিবীয়রা এই জয়ের ধারা বজায় রেখে ট্রফি নিজেদের করে নেয়।
সান নিউজ / রাজীব