ইসরায়েলি চেকপয়েন্টে স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই চরম অনিশ্চয়তা, অভাব আর একাকীত্বে দিন কাটছে রাজা আল-শাওইশের। সকালের আলো ফোটার পর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত সন্তানদের লালন-পালন ও পরিবারের খাবার জোগাড় করার অন্তহীন লড়াই চালাতে চালাতে হারিয়ে গেছে তার জীবনের পুরোনো সব চেনা ছন্দ ও নারীসত্তা। পশ্চিম গাজা সিটির একটি অবরুদ্ধ ক্লাসরুমে বিগত দুই বছর ধরে আশ্রয় নেওয়া রাজা আক্ষেপ করে জানান, যুদ্ধ শুরুর প্রথম বছর স্বামী পাশে থাকায় সেই চরম দুর্দিনও কিছুটা সহনীয় ছিল।
কিন্তু তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর এবং খাদ্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করার পর থেকে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে একে একে নিজের সব সোনা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। কেবল একটি শেষ গহনা সযত্নে জমিয়ে রেখেছেন এই বিশ্বাস থেকে যে, তার স্বামী একদিন অক্ষতশরীরে ফিরে আসবেন এবং সেদিন সেই সোনা বিক্রি করে তিনি উৎসব করবেন।
২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তর গাজায় দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের সময় রাজা আল-শাওইশের স্বামী মুহাম্মদকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তাকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং প্রতিবাদ করায় সেনাসদস্যরা তার ওপর নৃশংস শারীরিক নির্যাতন চালায়।
এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দারস্থ হয়েও স্বামীর কোনো হদিস পাননি রাজা। চারপাশের মানুষ তাকে স্বামীর মৃত্যুর আশঙ্কা মেনে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, তার প্রিয় মানুষটি এখনো জীবিত আছেন এবং কোথাও বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতে কেবল ব্যক্তিজীবন বা পরিবারই ভেঙে পড়েনি, তছনছ হয়ে গেছে গাজার সামগ্রিক সামাজিক কাঠামো। তীব্র দারিদ্র্য, লাগাতার বাস্তুচ্যুতি এবং চরম গাদাগাদি করে বসবাসের ফলে মানুষের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও পারস্পরিক বিরোধ বেড়েছে। এই সামাজিক বিপর্যয় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনোদিন পুরোপুরি ঠিক করা সম্ভব হবে না।
এদিকে, গাজার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন শুরু হয় কেবল বেঁচে থাকার মৌলিক তাগিদ মেটানোর তীব্র লড়াই দিয়ে। ভোরবেলা থেকেই পানির লাইনে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নিহাদ আল-স্কাফি নামের পাঁচ সন্তানের এক জনককে। যুদ্ধের আগে যিনি নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে সচ্ছল জীবন কাটিয়েছিলেন, তার এখন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত একটাই কাজ—পরিবারের জন্য এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি ও সামান্য খাবার সংগ্রহ করা।
রান্নার গ্যাস না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে। গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পালা পেরিয়ে মাস পার হয়ে গেলেও সরবরাহ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে লাকড়ি কুড়িয়ে আগুন জ্বালাতে হচ্ছে তাদের।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎহীন গাজায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া বা বেঁচে থাকার অন্যান্য ছোটখাটো চাহিদার জন্যও চড়া মূল্য চুকাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রাইভেট জেনারেটর বা সোলার প্যানেলের মাধ্যমে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করে অনেকেই এটিকে নতুন জীবিকা বা আয়ের মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছেন।
তবে কর্মহীন ও চরম আর্থিক সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এই সামান্য খরচটুকুও বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে মুদি দোকান বা চার্জিং পয়েন্টগুলোতে চড়া ঋণের বোঝা বাড়িয়ে চলেছেন। প্রতিদিনের এই টিকে থাকার লড়াই ফিলিস্তিনিদের জীবনকে এক মর্মান্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডিতে রূপ দিয়েছে।
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন সান নিউজের রিপোর্টার রাজীব দাস।
সান নিউজ / রাজীব