সচিব পরিচয়ে প্রতারণা করে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—ভুয়া সচিব মো. শাহাবুদ্দিন হাওলাদার ওরফে খলিলুর রহমান ওরফে মিজানুর রহমান (৪৮), কথিত জমির মালিক সুমন আহমেদ ওরফে জাহাঙ্গীর আলম (৩৯) এবং জমির দালাল মো. জাহাঙ্গীর আলম শাহীন ওরফে সাইফুল (৫২)।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, রাজধানীর দারুস সালাম এলাকায় বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুক হোসেন (৪৯) জমির শেয়ার বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেন। বিজ্ঞাপন দেখে সাইফুল ওরফে শাহীন নামে এক ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজেকে একজন সচিবের হয়ে জমি কেনার জন্য যোগাযোগকারী হিসেবে পরিচয় দেন।
পরবর্তীতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ফারুক হোসেনকে কথিত ওই সচিবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর তাকে ধানমন্ডির একটি অভিজাত বাসভবনে নেওয়া হয়। সেখানে আধুনিক গাড়িতে আসা এক ব্যক্তিকে সচিব হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তি জানান, তিনি সরাসরি জমি কিনতে পারবেন না। তাই তার মাধ্যমে জমি কেনার প্রস্তাব দেন।
পিবিআই জানায়, প্রতারকরা সাভারের বিলামালিয়া মৌজার ৫৮ শতাংশ জমি কেনার প্রস্তাব দেয়। জমিটির মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বলে জানানো হয়। কথিত সচিবের মাধ্যমে জমিটি কিনে পরে বিক্রি করলে এক কোটি টাকা লাভ হবে—এমন প্রলোভনও দেখানো হয়।
ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রতারকরা তার সামনেই কথিত জমির মালিককে এক লাখ টাকা নগদ অগ্রিম দেওয়ার অভিনয় করেন। পরে জমি কেনার জন্য ১০ লাখ টাকা বায়না দাবি করা হয়। তাদের কথায় বিশ্বাস করে ফারুক হোসেন ব্যাংক ও বাসা থেকে টাকা সংগ্রহ করে কথিত জমির মালিককে ১০ লাখ টাকা দেন।
এরপর ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বায়নাপত্র করার কথা বলে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে বায়নাপত্রের মূল কপি দেওয়ার কথা বলে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করা হলে তিনি সেই অর্থও দেন। এভাবে মোট ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার পর প্রতারকরা বায়নাপত্র না দিয়ে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে।
পিবিআইয়ের তথ্যমতে, প্রতারণার বিষয়টি গোপন রাখতে চক্রটি ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন সময় নানা অজুহাত দিত। কখনো কথিত সচিবের অফিসে, আবার কখনো ভাড়া বাসায় নিয়ে যাওয়া হতো। এমনকি কথিত জমির মালিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি—এমন গল্পও সাজানো হয়। ভুক্তভোগীর আস্থা ধরে রাখতে ভুয়া স্ট্যাম্প ও কথিত আইনজীবীর প্রসঙ্গও ব্যবহার করা হয়।
পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পেরে ফারুক হোসেন পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি।
তদন্তের একপর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রথমে কথিত জমির মালিক জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কথিত সচিব শাহাবুদ্দিন হাওলাদার ও দালাল সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, গ্রেপ্তার তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রতারণা এবং আত্মসাৎ করা ৩০ লাখ টাকা ভাগ করে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানায় পিবিআই।
তদন্তে প্রতারণায় ব্যবহৃত ভুয়া বায়নাপত্রের স্ট্যাম্প, কথোপকথনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলাটি দারুস সালাম থানায় দায়ের করা হয়। পরে জনস্বার্থে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) স্বউদ্যোগে মামলাটির তদন্ত শুরু করে।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে জমি কেনাবেচা, আর্থিক লেনদেন, মোবাইল ও অনলাইন যোগাযোগ এবং বাড়িভাড়া বা ব্যবসায়িক চুক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও তথ্য যাচাই করে সতর্কতার সঙ্গে লেনদেন করার আহ্বান জানানো হয়।
সান নিউজ/ রাব্বি