সংগৃহীত
জাতীয়

লাগামহীন ‘বাংলার টেসলা’, ঢাকার সড়কে আতঙ্ক

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

ঢাকার রাত যত গভীর হয়, শহরের ব্যস্ততা ততটা কমে এলেও বিদ্যুতের চাহিদা সবসময় একইভাবে কমছে না। এর পেছনে অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং ব্যবস্থা। রাস্তার পাশে, গলির ভেতর, ফুটপাত ঘেঁষে কিংবা বিভিন্ন গ্যারেজে রাতভর চলছে এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ।

ফলে মানুষের ঘুমের সময়ে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—এই চার্জিং ব্যবস্থার একটি বড় অংশই অনুমোদিত নয় বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ করতে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে আনুমানিক ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। বিপুল এই বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশ যদি অননুমোদিত সংযোগের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে তা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ লাখ। সরকারি বিভিন্ন হিসাব আবার দেশে এসব যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখের মধ্যে বলে উল্লেখ করে। অর্থাৎ মোট সংখ্যা নিয়ে তথ্যের পার্থক্য থাকলেও ব্যাটারিচালিত যান যে ব্যাপকভাবে বেড়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে খুব একটা দ্বিমত নেই।

একেকটি রিকশায় সাধারণত চার থেকে ছয়টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। ব্যাটারিগুলো সম্পূর্ণ চার্জ হতে প্রায় পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। ব্যবহৃত ব্যাটারির ধরন ও চার্জিং পদ্ধতি অনুযায়ী একটি রিকশায় প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৯ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে।

চার্জিং ব্যবস্থাকে নিয়মের মধ্যে আনতে রাজধানীতে অনুমোদিত স্টেশন রয়েছে। তবে বাস্তবে এর বাইরেও অসংখ্য অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট গড়ে উঠেছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং প্রায় এক হাজার রিকশা গ্যারেজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব স্থানে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে রিকশার ব্যাটারি চার্জ করা হয়।

কোনো কোনো গ্যারেজে দৈনিক জমার সঙ্গে চার্জিংয়ের খরচও যুক্ত থাকে। আবার যেসব চালকের নিজস্ব গ্যারেজ নেই, তারা আলাদা অর্থ দিয়ে অন্যের গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ করান।

বাড্ডা এলাকার এক রিকশাচালকের ভাষ্য, অনেক গ্যারেজে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে ব্যাটারি চার্জ করা হয়। বৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় অনেক গ্যারেজ মালিক অননুমোদিত সংযোগের দিকে ঝুঁকছেন বলেও তিনি জানান।

ব্যাটারিচালিত রিকশার অধিকাংশ চালক দিনের বড় সময় রাস্তায় থাকেন। ফলে রাতেই ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রবণতা বেশি। শহরের একাধিক এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টগুলোতে রিকশার সারি দেখা যায়।

সিপিডির গবেষণায় এই রাতের অনিয়ন্ত্রিত চার্জিংকে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনহীন সংযোগের কারণে বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যবহার ও রাজস্ব আদায়ের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকেও অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-বাইক চার্জ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান আরও জোরদারের কথাও জানানো হয়েছে।

শুধু বিদ্যুতের ব্যবহার নয়, ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মূল সড়ক, অলিগলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, ফ্লাইওভারের নিচ কিংবা ওভারব্রিজসংলগ্ন এলাকাতেও এসব যান ব্যাপকভাবে চলাচল করছে।

অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক সংকেত উপেক্ষা, উল্টো পথে চলা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন কিংবা আকস্মিক মোড় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশেষ করে দ্রুতগতির যানবাহনের সামনে হঠাৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে আসা কিংবা আচমকা ব্রেক করার ঘটনায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। রিকশার কাঠামো, ব্রেকিং সিস্টেম, টায়ার ও চাকার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালকদের নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; রিকশার কাঠামোগত পরিবর্তনও জরুরি। একই সঙ্গে ব্রেক, টায়ার ও স্পোকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশকে উন্নত মানের করার প্রয়োজন রয়েছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, বেড়িবাঁধ, বসিলা, ঢাকা উদ্যান, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, উত্তরা, মুগদা, মান্ডা, বাড্ডা, নতুনবাজার, আফতাবনগর ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও চার্জিং পয়েন্টের উপস্থিতি বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মোহাম্মদপুরের এক গ্যারেজ মালিকের দাবি, বৈধ সংযোগে চার্জিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও অনেক গ্যারেজে অননুমোদিত সংযোগ ব্যবহার করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড় গ্যারেজে দিনে ও রাতে মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক রিকশা চার্জ দেওয়া হয় এবং প্রতিটি ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকার সড়কে নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শহরের বিভিন্ন অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় এসব যান চলাচল করছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বিস্তার অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে এসব যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। একপর্যায়ে রাজধানীর প্রধান সড়কেও তাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে দেখা যায়।

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে অতীতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবে কার্যকর হয়নি। কখনো চলাচল বন্ধের ঘোষণা, কখনো নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদান, কিউআর কোড ব্যবহার, অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট উচ্ছেদ কিংবা এলাকাভেদে রিকশার রং আলাদা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এসব উদ্যোগের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে নিয়ন্ত্রণের বদলে অনেক ক্ষেত্রেই এসব যান আরও বিস্তৃত হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, অনুমোদনহীন কারখানায় যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি বন্ধে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত কারখানা ছাড়া অন্য কোথাও এসব যান তৈরি করা যাবে না। অনুমোদিত কারখানাগুলোতে রিকশার নকশা ও কারিগরি মান যাচাইয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহায়তা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

অর্থাৎ শুধু রাস্তায় চলাচল নিয়ন্ত্রণ নয়, রিকশা তৈরির পর্যায় থেকেই মান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে আরও মানসম্মত বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের পাশাপাশি সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সৌরশক্তিনির্ভর চার্জিং অবকাঠামো তৈরি করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট নীতিমালা, নিরাপদ চার্জিং অবকাঠামো, মানসম্মত যান এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঘিরে তৈরি সংকট এখন আর কেবল যানবাহন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব ক্ষতি, নগর পরিকল্পনা, সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং লাখো চালকের জীবিকার প্রশ্ন।

তাই শুধু অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট উচ্ছেদ কিংবা রাস্তায় অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে শুরু করে নিবন্ধন, চালক প্রশিক্ষণ, নির্ধারিত রুট, নিরাপদ নকশা, বৈধ চার্জিং অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঠিক হিসাব—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনা।

ঢাকার সড়কে যাত্রী পরিবহন ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠা ‘বাংলার টেসলা’কে পুরোপুরি বন্ধ করা যেমন সহজ নয়, তেমনি লাগামহীনভাবে চলতে দেওয়াও ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই এখন মূল প্রশ্ন—এই বিশাল পরিবহন ব্যবস্থাকে কীভাবে নিরাপদ, বৈধ ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে আনা যায়। সেই সমাধান কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ঢাকার রাতের বিদ্যুৎচাপ আর দিনের সড়ক আতঙ্ক—দুটিই বহাল থাকার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

মস্কোয় ইউক্রেনের বড় ড্রোন হামলা

রাশিয়ার মস্কো অঞ্চলে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে দুজন নিহত ও ছ...

ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে নিউমার্কেট, ব্যাহত যান চলাচল

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারী বৃষ্টিতে নিউমার্কেট ও আশপাশে...

ইংল্যান্ড দল থেকে সরে দাঁড়ালেন কোল পালমার

ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলে ফের ডাক পেলেও ইনজুরির কারণে স্কোয়াড থেকে সরে দাঁড়াচ...

বিশ্বমঞ্চে দেশের মানুষের কথা বলবেন তারেক রহমান

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর তাদের...

রাঙ্গাবালীতে মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা, প্রেমিক যুবক গ্রেপ্তার

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ১৪ বছর...

সরকারের সাফল্য স্বাস্থ্যখাতের ওপর নির্ভর করছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সরকারের বড় সাফল্য অনেকটাই স্বাস্থ্যখাতের ওপর নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেছেন স...

বিটিভির সাবেক মহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম রবু মারা গেছেন

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সাবেক মহাব্যবস্থ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা