সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
মতামত

ধর্ষণ শুধু যৌনতা নয়, ক্ষমতারও প্রকাশ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

ধর্ষণের খবরের নির্মাণ কী বদলে যাচ্ছে? দীর্ঘ দিন খবর ভাঙা-গড়ার কাজটা করছেন সাংবাদিকরা। ভুল শুদ্ধ অনেক কিছুকে সাথী করে সাংবাদিকরা ধর্ষণসহ সব ধরনের নারীর নির্যাতনের খবর করে গেছেন। সাথে ছিল সমাজ। তাদের নিরন্তর নির্মাণের ফলেই ধর্ষণের খবরগুলো বেশি করে উঠে আসছে।

কিন্তু হঠাৎ করে মনে হচ্ছে ধর্ষণের খবর করা আবার জটিল হয়ে উঠছে। রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্তরা সবাই ছাড়া পেয়েছে। তারা বেশ উৎফুল্লভাবে বেরিয়ে যাবে। মামলার প্রসিকিউশন দুর্বলতা, তদন্ত দুর্বলতায় অনেক অপরাধই শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণে যখন পুলিশকে বলা হয় যে, ৭২ ঘণ্টা পার হলে ধর্ষণ মামলা না নিতে, তখন ধর্ষণ সম্পর্কে নতুন করে সামাজিক ধারণা নির্মিত হয়। আদালত যখন বলে, ‘মামলার দুই ভিকটিম বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভিকটিম দুজনই আগে থেকেই সেক্সুয়াল কাজে অভ্যস্ত’ তখন নতুন করে নারীদের নিয়ে ধারণা নির্মিত হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে যখন পুলিশকে বলা হয় যে, ৭২ ঘন্টা পার হলে ধর্ষণ মামলা না নিতে, তখন ধর্ষণ সম্পর্কে নতুন করে সামাজিক ধারণা নির্মিত হয়। আদালত যখন বলে – ‘মামলার দুই ভিকটিম বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভিকটিম দুজনই আগে থেকেই সেক্সুয়াল কাজে অভ্যস্ত’ তখন নতুন করে নারীদের নিয়ে ধারণা নির্মিত হয়।

আদালতের এ ধরনের পর্যবেক্ষণে আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের ঘটনা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলো। এমনিতেই সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হলে সহজে মুখ খোলেন না, মামলা করতেও তাদের বারবার ভাবতে হয়। ধর্ষকরা প্রভাবশালী হলে মেয়েদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে যায়। অনেক ঘটনাই সামাজিকভাবে, এমনকি পুলিশের হস্তক্ষেপে তথাকথিত সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। মামলা নিতে পুলিশের গড়িমসির অভিযোগও পুরোনো। আবার প্রান্তিক পর্যায়ের মেয়েরা বেশিরভাগ সময়ই সামাজিক বা আইনি কোনো সংগঠনের সাহায্য ছাড়া ধর্ষণের মামলা দায়ের করতেই পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পর মামলা না নিতে বিচারকের ‘পরামর্শ’ গোটা প্রক্রিয়াটি আরও জটিল করে তুলবে।

আদালতের এমন পরামর্শ আরও সংশয় তৈরি করবে। আদালত তদন্তের দুর্বলতার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মামলা না করলে মামলা না নেওয়ার পরামর্শ সুবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হয়নি। ফলে ধর্ষক ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। তাছাড়া ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সবার পক্ষে মামলা করতে আসা সম্ভবও নয়। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার ক্ষেত্রে, যেটি আমরা বেগমগঞ্জের ঘটনায় দেখেছি।

আসলে কারও পরিবারে কেউ শিশুকন্যা, বালকপুত্র, তরুণী বোন, স্ত্রী, এমনকি প্রৌঢ়া মা যদি ধর্ষণের শিকার না হয় তাহলে ধর্ষক বিষয়ে মানবিক সহানুভূতি থাকা দোষের কিছু নয়। বরং ধর্ষিতার মৃত্যুকামনা করাই আমাদের হৃদয়ের ব্যাপ্তি প্রমাণ করে। ধর্ষিতাকে এ সমাজ, পরিজন, এমনকি সে নিজে কী চোখে দেখে সেটা নতুন করে উঠে এলো বুঝি।

আমরা ভাবছিলাম বাংলাদেশের সমাজ এখন আর সম্পূর্ণভাবে পুরুষতন্ত্র ও তার ধ্বজাধারীর কবলে নেই। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষকে লিঙ্গপরিচয়ের ঊর্ধ্বে দেখার চোখ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কোথাও বুঝি ভুল হচ্ছে আসলে। আমাদের সমাজে ধর্ষিতাকে শাস্তি দেওয়ার আইন নেই কিন্তু রেওয়াজ আছে। সেই রেওয়াজটা শক্তিশালী করছি কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার। ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধ ধর্ষকের; দোষ, পাপ, অন্যায়, অনৈতিকতা ধর্ষকের– এ কথাটা জোর গলায় বলতে পারব কি না সে নিয়েও সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে।

ধর্ষকের শাস্তি কী বা কত দূর হওয়া উচিত সেটা আইনের বিষয়। কিন্তু এখন আমাদের বিবেচনা করতে হবে ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি সমাজের বিবিধ বিচিত্র মনোভাব। ধর্ষকের মনোভাব বা চিত্তশুদ্ধি ও সংশোধন সম্ভব কি না সে আলোচনা আর নাইবা হোক। একটি মেয়ে শুধু কিছু মাংস ও যৌন পুতুল এই মনোভাবের উৎস কোথায় সেটা জানার চেষ্টাও আর না করি।

ধর্ষণ এমনই এক মর্মবিদারী অপমানজনক এবং অপরিমেয় পীড়াদায়ক ঘটনা, এমনই সুদূরপ্রসারী তার পরিণাম যে, যারা সেই পরিণাম কাছ থেকে দেখেননি, ধর্ষকের প্রতি তাদের ক্রোধ, ঘৃণা, প্রতিশোধস্পৃহা কখনও তাদের সমান হবে না যারা সেই দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। পথে-ঘাটে চলাফেরাকালীন বিকৃত পুরুষের নোংরা ইঙ্গিত বা ছুঁয়ে দেওয়ায় ঘৃণা সঞ্চার করে, তীব্র ক্রোধ জাগায়, অপমানের সঙ্গে অসহায়তার গা রি-রি করা ভাব মনে লেগে থাকে দিনের পর দিন। দণ্ডবিধানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ অনুভূতি। সেই অনুভূতি কী জাগাতে পারে বিচার ব্যবস্থা?

ধর্ষণকাণ্ডে অপরাধীর কঠিন শাস্তি চায় সবাই। তবে এর চেয়ে বেশি জরুরি মনে রাখা যে, সম্মান মৃত্যুর চেয়ে বড়। ধর্ষণে একজন ব্যক্তির যে চরম অপমান অসম্মান, আর কোনো ঘটনাই তার তুল্য নয়। তাই, ধর্ষকের শাস্তি দানের প্রচেষ্টায় কোথাও যেন খাদ না থাকে, কোন পর্যবেক্ষণে যেন ভুক্তভোগীদের অসন্মান না করা হয়। ধর্ষণ মূলত পুরুষের যৌনতার প্রকাশ নয়, ক্ষমতার প্রকাশ। সে কথা যেন বারবার প্রমাণিত হয় আমাদের সমাজে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

সান নিউজ/এফএইচপি

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে নিউইয়র্কের উ...

ড্রোন হামলার মধ্যেই রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের দলের জয়

রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট দুমার নির্বাচনে সহজ জয়ের পথে রয়েছে দেশট...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় ২৬ লাখ ইউরো দিলেন মেসি

ফুটবল মাঠের বাইরেও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন লিওনেল মেসি। এ...

বাংলাদেশ–ইউনান বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক...

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা