মতামত

শিক্ষায় ভ্যাট বিরোধী কর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা

ফারুক আহমাদ আরিফ

পৃথিবীর আদিকাল হতেই মানুষ ভুল, অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও আন্দোলনমুখি হয়েছে। এতে অসংখ্য আদম সন্তানের প্রাণ ঝরেছে। সফলতা লাভ করেছে, কোনটি করেনি। তবে কারো প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম বৃথা যায়নি। তাৎক্ষণিক না হলেও পথ-পরিক্রমায় শতাব্দি বা সহস্র বছর পর সফলতা এসেছে। কোন আন্দোলন অহিংস থেকে রক্তারক্তিতে পরিণত হয়ে খালি হয়েছে মা ও বাবার বুক। বোনের কান্নায় প্রকম্পিত হয়েছে চারপাশ। ভাইয়ের আহাজারিতে বিদীর্ণ হয়েছে প্রকৃতি। বন্ধুদের আত্ম-চিৎকারে থেমে গেছে বাতাসের গতিপথ। ঘুরে গেছে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি।

আজ লেখার বিষয় নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলনের সংগঠক ও কর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা নিয়ে। ২০১৫ সালের ৪ জুন তৎকালীণ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের যাবতীয় ব্যয়ভারের উপর ১০ শতাংশ ভ্যাট (কর) আরোপ করে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে। অথচ শিক্ষা হচ্ছে মৌলিক অধিকার। মানুষ যে ভূ-খণ্ডে জন্মগ্রহণ করবে সেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে তার জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু আমাদের এই দেশে সেটির পরিবর্তে বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং ভ্যাট বসিয়ে সেটিকে পণ্যে পরিণত করছে। এটি মহা-অন্যায়। অবশ্য এটি নতুন কিছু নয় কারণ ২০১০ সালেও একই অর্থমন্ত্রী সাড়ে ৪ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছিলেন উচ্চশিক্ষায়।

৭ জুন বন্ধু বাশার জানালো সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তথা উচ্চশিক্ষায় ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে। আমরা স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান সজীব সরকার স্যারের সাথে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। তিনি নানা ধরনের বুদ্ধি, পরামর্শ ও সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। সেইদিনই অন্যান্য বিভাগ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে আলাপ করলাম আন্দোলন করার বিষয়ে। সবাই রাজি হলেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার। আমরাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা কাজ শুরু করে দিলাম। প্রথমে কাজে নামেন আরিফ চৌধুরী শুভ স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে। তিনি ১৪ মে উচ্চশিক্ষা ভ্যাট আরোপ হতে পারে মর্মে সংবাদ শুনে গণমাধ্যমে চিঠি লেখেন। এতে ৭১ টেলিভিশন সারা দিয়ে কাজ শুরু করে। ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শক্রমে ভ্যাট ১০ শতাংশ হতে কমিয়ে ৭.৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে সংসদ অধিবেশন মূলতবী ঘোষণা করা হয়। ৩০ জুন ধানমন্ডিতে ইউল্যাব ইউনিভার্সিটির ফারহান হাবিব ভাইকে প্রধান সমন্বয়ক করে নো ভ্যাট অন এডুকেশন সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। আমরা জুলাই মাসে প্রায় ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়কে সাথে নিয়ে নো ভ্যাট অন এডুকেশন সংগঠনে যুক্ত হই। সেদিন ফারহান ও জিহান উপস্থিত ছিলেন। আমাদের একেরপর এক কর্মসূচি চলতে থাকে।

আন্দোলন চালাতে গিয়ে ফারহান তার প্রিয় গিটার বিক্রি করে দিতে মনস্থির করেন। ১৬ আগস্ট তিনি আন্দোলন থেকে চলে গেলে সকলের সিদ্ধান্তে আমাকে প্রধান সমন্বয়ক নির্বাচন করা হয়। তবে প্রধান সমন্বয়কের পরিবর্তে মুখপাত্র ও সমন্বয়কের স্থলে সংগঠক বলা ও লেখা সিদ্ধান্ত হয়। বাশার প্রায় সময়ই ভ্যাট প্রত্যাহারে কিভাবে আন্দোলনকে বেগবান করা যায় তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। ১৩ আগস্ট মারুফ ভাইকে তার জুতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, কাল রাত থেকে আল্লাহর কাছে দোআ করছি তিনি যেন আমার প্রাণের বিনিময়ে উচ্চশিক্ষা থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করেন অথচ মিছিলে শুধু জুতা গেল। সকাল আপা, অনির্বাণ, মাহি, রবি, উমর ভাইসহ অনেকে থাকতো সংগঠনকে মজবুত ও উজ্বীবিত করতে। তানভীর ও রোবায়েত ছিল কর্মসূচির ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত। তবে তানভীর ছিল খুবই পাগলপারা।

ইউআইইউতে নাঈম, মেজবাহ, মারুফের সফল নেতৃত্ব। বিশেষ করে মারুফের কুরবান ছিল খুব বড় ধরনের। নিজে কখনো সামনে আসেনি তবে সাংগঠনিক দক্ষতা আমাদের আশ্চার্যিত করতো। স্টামফোর্ডে আরিফ শুভর নেতৃত্বে মিছিলগুলো ছিল প্রকম্পিত। সাথে ছিল জ্যোর্তিময়, সজীব, সুজাসহ শিক্ষার্থীরা। ইউডাতে ফারুক, ইমরান, মারুফ। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির আয়াজ খানের নেতৃত্বে একদল তরুণ। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইভান, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির রেজওয়ান, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির সজীব, উত্তরায় সামির, সৌরভ, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশ, কৌশিকদের নেতৃত্ব ছিল বলিষ্ট। লিয়ন ও শুভদের ত্যাগের কথাও ভুলার নয়।

চট্টগ্রামে রায়হান ওয়াজেদ ঈদের পোশাক না কিনে আন্দোলন সংগঠিত করেছেন ফাহাদকে নিয়ে। শিমুল, আলিনুর সিদ্দিকসহ সেই অঞ্চলের সংগঠকরা ছিল। রাজশাহীতে তামিমরাসহ সিলেটের সংগঠকরা ভয়াবহ হুমকি উপেক্ষা করে কাজ করেছেন।

পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে নো ভ্যাট অন এডুকেশনের পক্ষে কলাম, সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ হতে থাকে। আন্তর্জাতিক সংসদগুলোতে আমাদের পক্ষে মতামত ব্যক্ত হতে থাকে।
ইস্টওয়েস্টে মিঠু মোহাম্মদ, কাকনসহ অন্যান্য সংগঠকরা। সেখানে ৯ সেপ্টেম্বর মানববন্ধনে পুলিশ গুলি চালালে আন্দোলনে স্ফুলিঙ্গ উঠে। সেই আগুন দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে দেই। আমরা কুরবানির ঈদের পরে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে দেশকে স্থবির করে দেওয়ার যে, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ইস্টওয়েস্টে পুলিশ গুলি করায় সেটি ঈদের আগেই ঘোষণা করি। শিক্ষার্থীসহ দেশবাসী সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আন্দোলনকে বিশ্বের ইতিহাসে একমাত্র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পরিণত করে সফলতার পতাকা উড়িয়ে দেয়। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞচিত সিদ্ধান্তে ১৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ উচ্চশিক্ষা হতে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিয়ে শিক্ষাকে পণ্যের হাত থেকে রক্ষা করেন। ধন্যবাদ মন্ত্রিপরিষদ, ধন্যবাদ সংগঠক, কর্মী ও দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক ব্যক্তিবর্গ।

অনেক সংগঠকের সাথে আন্দোলন পরবর্তী সময়ে কথা হয়েছে। তাদের পরিশ্রম, ত্যাগ-তীতিক্ষার কথা শুনে অভিভূত হয়েছি। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি আন্দোলনের কর্মীরা মানবকল্যাণে নিবেদিত না হলে সেটি সাফল্যের মুখ খুব কমই দেখে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একদল আত্মত্যাগী মানুষ পেয়েছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র উপহার দিতে পেরেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদের পতন ঘটিয়ে মানুষের জয়গান গেয়েছেন।

আন্দোলন করতে গিয়ে নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলনের সংগঠক, কর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও নির্লোভ অবস্থা দেখে এ কথা বিশ্বাস জেগেছে যে, আমরা ঐক্যবন্ধভাবে যদি বিশ্বকে নেতৃত্ব দেই তবে এ ধরায় শান্তিুর বৃক্ষ অনন্তকাল ফল দিবে। প্রতিটি প্রাণি তার অধিকার ফিরে পাবে। অসংখ্য সংগঠক ও কর্মীরা রয়েছেন ফুলের ঘ্রাণে মাটির রসের মত অলক্ষে, তাদের সকলের প্রতিও কৃতজ্ঞতা...।

লেখক: মুখপাত্র (প্রধান সমন্বয়ক)- নো ভ্যাট অন এডুকেশন

novatoneducation15@gmail.com

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

মস্কোয় ইউক্রেনের বড় ড্রোন হামলা

রাশিয়ার মস্কো অঞ্চলে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে দুজন নিহত ও ছ...

ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে নিউমার্কেট, ব্যাহত যান চলাচল

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারী বৃষ্টিতে নিউমার্কেট ও আশপাশে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

ইংল্যান্ড দল থেকে সরে দাঁড়ালেন কোল পালমার

ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলে ফের ডাক পেলেও ইনজুরির কারণে স্কোয়াড থেকে সরে দাঁড়াচ...

বিশ্বমঞ্চে দেশের মানুষের কথা বলবেন তারেক রহমান

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর তাদের...

রাঙ্গাবালীতে মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা, প্রেমিক যুবক গ্রেপ্তার

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ১৪ বছর...

সরকারের সাফল্য স্বাস্থ্যখাতের ওপর নির্ভর করছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সরকারের বড় সাফল্য অনেকটাই স্বাস্থ্যখাতের ওপর নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেছেন স...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা