চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে রক্তক্ষয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট কমাতে এবার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। দুই দেশের মধ্যকার চলমান লড়াইয়ের তীব্রতা যখন দিন দিন বেড়েই চলেছে, ঠিক তখনই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তিন দফার একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর যুদ্ধের প্রভাব কমাতে এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতের এই শান্তি প্রস্তাবটি সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে ইউক্রেনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সামনে।
কিয়েভ সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই সিবিহার সঙ্গে বৈঠকে এই তিন দফা রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এই বৈঠকে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় সেই বিষয়গুলোর ওপর, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব।
নয়াদিল্লির প্রস্তাবের প্রথম এবং প্রধান দিকটি হলো জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় সব ধরনের আক্রমণ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা। যুদ্ধের সূচনাকাল থেকেই উভয়পক্ষ একে অপরের পাওয়ার প্ল্যান্ট, জ্বালানি সরবরাহ লাইন এবং বিভিন্ন জরুরি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়ে আসছে। এর ফলে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ার পাশাপাশি চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। ভারতের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো গেলে যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহণ ও সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে সমুদ্রপথে চলাচলকারী কার্গো বা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাতের বাইরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষ্ণসাগরের বিভিন্ন রুটে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এই রুটে চলাচলকারী একটি কার্গো জাহাজে সম্প্রতি ড্রোন হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাবিকের উপস্থিতি থাকায় ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তৃতীয় ও শেষ দফায় কৃষ্ণসাগরের জলপথ ব্যবহার করে অবাধে খাদ্যশস্য ও জ্বালানি পরিবহণ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। ভারত শুরু থেকেই এ বিষয়ে সোচ্চার রয়েছে যে, যুদ্ধের কারণে খাদ্য, সার এবং জ্বালানির মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের পথ অবরুদ্ধ হলে তার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয় বিশ্বের উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোকে। তাই কৃষ্ণসাগরের এই কৌশলগত বাণিজ্যপথ যেকোনো মূল্যে সচল ও নিরাপদ রাখার ওপর জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
এদিকে কিয়েভ জানিয়েছে যে, এর আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের কাছ থেকে তারা একাধিক যুদ্ধবিরতির রূপরেখা পেয়েছে। আমেরিকা, তুরস্ক এবং মিশরের মতো দেশগুলোর পাশাপাশি ইউক্রেন নিজেও তাদের জ্বালানি অবকাঠামো ও বন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। ভারতের এই সুচিন্তিত কূটনৈতিক উদ্যোগ বিশ্বমঞ্চে শান্তি ফেরানোর প্রচেষ্টায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সান নিউজ / রাজীব