সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে বলে দাবি করেছে দেশটির সরকার। প্রণালির আশপাশে ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেই এ দাবি করা হলো।
সোমবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-ইরানি।
গত মাসে বাব আল-মান্দেব প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দুবাব দখলে নেয় হুথিরা। এরপর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি বিমানবাহিনীর সহায়তায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে দাবি করেছে সরকার।
তথ্যমন্ত্রী ইরানি বলেন, সরকারি বাহিনী প্রণালির অভ্যন্তরে অবস্থিত দুবাবের বিমানক্ষেত্র দখল করেছে। সেখানে আটকে থাকা হুথি যোদ্ধাদের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। তবে ইয়েমেন সরকারের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রণালির কাছের একটি সামরিক ঘাঁটিতে এখনও লড়াই চলছে।
হুথিদের পাল্টা দাবি
সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির খবর প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা। গোষ্ঠীটির দাবি, ইয়েমেন সরকারের বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য। একই সঙ্গে সৌদি আকাশসীমায় উড়ন্ত যেকোনো বিমানকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকিও দিয়েছে তারা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাব আল-মান্দেবের আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চল সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুথিদের হামলার সুযোগ কিছুটা সীমিত হতে পারে। তবে উপকূলের ভেতরের এলাকা ও দূরবর্তী অবস্থান থেকে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জাহাজ লক্ষ্য করার সক্ষমতা হুথিদের এখনও রয়েছে।
এদিকে ইয়েমেন সরকারের পাঁচটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, হুথিরা তাইজ শহরের কাছে পাল্টা কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। একটি পাহাড়ি সড়কের কয়েকটি অংশ দখল করে তারা সরকারি বাহিনীর অবস্থান ঘিরে ফেলেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সরকারের আরেকটি সূত্র সড়ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের স্থবির গৃহযুদ্ধ নতুন করে তীব্র হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন ফ্রন্টে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে হুথিরা।
এদিকে ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি ইতোমধ্যেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতিও আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর পর প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বড় সামরিক অভিযানের ঘোষণা
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার রোববার দেশটির বিভিন্ন এলাকা পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি বলেন, ‘সন্ত্রাসী মিলিশিয়া’দের হাত থেকে দেশ পুরোপুরি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া সৌদি আরব বিমান হামলার মাধ্যমে এ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে হুথিদের পিছু হটানো, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে মিত্রদের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও স্থলবাহিনীকে সুরক্ষা দিতে ইয়েমেনে হুথিদের শত শত অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইয়েমেন সরকারও জানিয়েছে, রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, সানা প্রদেশের সানহান ও সাওয়ান এলাকায় সৌদি বিমান হামলায় দুজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সান নিউজ/ রাব্বি