ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। গোয়ার ডোনা পাউলায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। পুনের অদূরে দোঞ্জে গ্রামের নিজস্ব খামারবাড়িতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে তার শেষকৃত্য। শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো বিনোদন জগতে।
অভাবের শৈশব থেকে অভিনয়ের আলোয়
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্ম নেওয়া নানা পাটেকরের জীবন সংগ্রাম ছিল দীর্ঘ। কৈশোরে সংসারের টানে চলচ্চিত্রের পোস্টার এঁকে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো তাঁকে। পরবর্তীতে মুম্বাইয়ের জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টসে পড়াশোনা শেষ করে নাট্যমঞ্চের মাধ্যমে অভিনয়ে আসেন। ১৯৭৮ সালে 'গমন' ছবির হাত ধরে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। আশির দশকের শেষভাগে 'অঙ্কুশ' ও 'সালাম বম্বে!' ছবির মাধ্যমে তিনি রূপালি পর্দায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
স্বতন্ত্র অভিনয় ও বহুমুখী চরিত্র
বিধু বিনোদ চোপড়ার 'পরিন্দা' ছবিতে খলচরিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতে নেন তিনি। এরপর নব্বইয়ের দশকে 'তিরঙ্গা', 'ক্রান্তিবীর', 'অগ্নিসাক্ষী' ও 'খামোশি'-র মতো ব্যবসাসফল ও নান্দনিক ছবিতে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। বিশেষ করে 'ক্রান্তিবীর' ছবির অনবদ্য প্রতিবাদী অভিনয় তাঁকে এনে দেয় সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। পাশাপাশি 'ওয়েলকাম' ছবিতে চমৎকার কমেডি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেন। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। অভিনয়ের পাশাপাশি ১৯৯১ সালে ‘প্রহার’ ছবি পরিচালনা করেও তিনি মুন্সিয়ানা দেখান।
প্রচারবিমুখ সাধারণ জীবনযাপন
তারকাখ্যাতির চাকচিক্য এড়িয়ে নিভৃতে থাকতে ভালোবাসতেন নানা পাটেকর। মুম্বাইয়ের ব্যস্ততা ছেড়ে পুনের ১৪ একরের খামারবাড়িতে কুকুর ও গৃহপালিত পশু নিয়ে কাটাতেন তাঁর অবসর। রূপালি পর্দার গ্ল্যামার থেকে দূরে সাধারণ সুতির পোশাকেই তাকে দেখা যেত সর্বত্র। অর্থের পেছনে ছোটার চেয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে বন্ধু মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’, যার মাধ্যমে হাজারো সংকটাপন্ন কৃষক পরিবার সহায়তা পেয়েছে। তবে নিজের এই জনহিতকর কাজের প্রচার তিনি কখনোই পছন্দ করতেন না।
মৃত্যুহীন প্রাণ ও দর্শন
জীবদ্দশায় নানা পাটেকর বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর পর মানুষকে কেউ মনে রাখে না—এই ভাবনা এক প্রকার ভ্রান্তি। অথচ আজ তার প্রয়াণের পর ফিরে আসছে 'পরিন্দা', 'ক্রান্তিবীর' কিংবা 'ওয়াজুদ'-এর সেই চিরস্মরণীয় চরিত্রগুলো। বৈচিত্র্যময় অভিনয়শৈলী, সমাজসেবা আর সাদাসিধে জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে গেছেন।
সান নিউজ / রাজীব