সারাদেশ

ইতালিতে ট্রিপল মার্ডার : এখনো মা জানেন না তার একমাত্র ছেলে বেঁচে নেই

গিয়াস রনি, নোয়াখালী

প্রায় ৬০ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের সংসারে এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। একমাত্র ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুলকে ঘিরেই ছিল তার সমস্ত স্বপ্ন, নির্ভরতা আর বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই ছেলে বিদেশে থাকলেও প্রতিদিন ফোন করতেন, মায়ের খোঁজ নিতেন, দেশে ফিরে মায়ের পাশে থাকার আশ্বাস দিতেন। কিন্তু ইতালির রাজধানী রোমে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের মেয়েসহ নিহত হয়েছেন বাবুল। অথচ নোয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রামের সেই মায়ের কাছে এখনো পুরো সত্যটি পৌঁছায়নি। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, তার ছেলে বেঁচে আছে, সুস্থ হয়ে একদিন ফিরে আসবে।

শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বিজয়নগর এলাকায় নিহত কামাল উদ্দিন বাবুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। ঘরে বসে বিলাপ করছেন মা জাহানারা বেগম। চোখের পানি মুছতে মুছতে বারবার বলছেন, আমার বাবুল আবার আইবো, আমার বাবুল কিছু হইব না।

তার এই আকুতি শুনে আশপাশে থাকা আত্মীয়-স্বজনরাও কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এখনো তাকে ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, বাবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে জীবিকার সন্ধানে ফুফাতো বোনের জামাই আমিন উল্যার সহায়তায় ইতালিতে পাড়ি জমান কামাল উদ্দিন বাবুল। বিদেশ যাওয়ার আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের মমতাজ বেগম আরজুকে। সময়ের সঙ্গে তাদের সংসারে জন্ম নেয় এক ছেলে অয়ন ও এক মেয়ে আরিশা। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ইতালিতে গড়ে তুলেছিলেন একটি সুখী সংসার। পরিবারের সদস্যদের আশা ছিল, কয়েক বছর পর দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন বাবুল। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায় গত শুক্রবার রাতে।

ইতালির স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিও এলাকায় ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটে। নিহত হন কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী কন্যা আরোয়া ইসলাম আরিশা। গুরুতর আহত হন তাদের ছেলে অয়ন, যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের দাবি, একই গ্রামের শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাবুলের স্ত্রীকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে থাকাকালীন সময় থেকেই আরজুর সঙ্গে শাহাদাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে পারিবারিক বিরোধ ছিল। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাবুল তার স্ত্রী-সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান। অন্যদিকে, প্রায় চার বছর আগে শাহাদাত হোসেন তার পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। পরে পারিবারিক বিচ্ছেদের পর তিনি ইতালিতে চলে আসেন বলে জানা গেছে।

স্বজনদের দাবি, ঘটনার দিন পারিবারিক বিরোধের সমাধানের উদ্দেশ্যে কামাল উদ্দিন, তার স্ত্রী ও সন্তানদের উপস্থিতিতে শাহাদাতের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের একপর্যায়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলে শাহাদাত ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন কামাল, তার স্ত্রী ও শিশু কন্যা। আহত অয়ন প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

ঘটনার পর সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি স্ট্যাটাস দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে তিনি লেখেন, "একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।"

শনিবার ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাতের ছবি প্রকাশ করে তাকে ট্রিপল মার্ডার মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানায়।
শাহাদাতের বড় ভাই, সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, "চার বছর আগে শাহাদাত তার সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না। আমি দুই মাস আগে দেশে এসেছি, এই সময়ের মধ্যেও তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।

নিহত কামাল উদ্দিনের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রায় এক বছর আগে দেশে আসার সময় তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়ে একটি উড়ো চিঠি পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি মৌখিকভাবে কোম্পানীগঞ্জ থানাকে জানানো হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। আমরা তখনও ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ভাবিনি, আমার ছেলেকে এভাবে হারাতে হবে।

ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে পার্ক এলাকা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

চরকাঁকড়ার সেই বাড়িটিতে এখন শুধু কান্না আর অপেক্ষা। একদিকে প্রিয় সন্তানকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে পুত্রবধূ ও নাতনির মৃত্যু সব মিলিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি। তবে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো এখনো জানেন না জাহানারা বেগম। তিনি এখনো অপেক্ষায় আছেন তার বাবুল একদিন দরজায় কড়া নাড়বে, বলবে, "মা, আমি আইছি।" কিন্তু সেই অপেক্ষার আর কোনো শেষ নেই।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, "তৎকালীন সময়ে ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।"

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে নিউইয়র্কের উ...

ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে নিউমার্কেট, ব্যাহত যান চলাচল

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারী বৃষ্টিতে নিউমার্কেট ও আশপাশে...

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় ২৬ লাখ ইউরো দিলেন মেসি

ফুটবল মাঠের বাইরেও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন লিওনেল মেসি। এ...

বাংলাদেশ–ইউনান বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক...

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা