ছবি: এআই।
বাণিজ্য
পর্ব-১

এক হচ্ছে পাঁচ ইসলামী ব্যাংক: স্বস্তি, নাকি নতুন ঝুঁকি?

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক দুর্বলতা, অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং সুশাসনের ঘাটতিতে বিপর্যস্ত পাঁচটি ইসলামী ধারার বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, এই পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সমস্যার মূল কারণ দূর না হলে শুধু একীভূতকরণে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।

যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত হচ্ছে

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একত্র করে নতুন ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, একীভূতকরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ।

ফরেনসিক অডিটে ভয়াবহ চিত্র

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট ও অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউতে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি। বিতরণ করা ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি বা আদায়-অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ডে যেখানে ১০ শতাংশ খেলাপি ঋণই উদ্বেগের বিষয়, সেখানে কয়েকটি ব্যাংকে এই হার প্রায় ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

কীভাবে তৈরি হলো এই সংকট?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, বিভিন্ন করপোরেট গোষ্ঠী ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের একটি বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে পাচার কিংবা অনুৎপাদনশীল খাতে চলে গেছে। পরবর্তীতে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও প্রকৃত আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়নি।

কেন একীভূতকরণের পথে সরকার?

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পৃথকভাবে পাঁচটি ব্যাংককে সচল রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল। একদিকে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের চাপ, অন্যদিকে তীব্র তারল্য সংকট ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছিল।

এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এনে একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠানে থাকবে একক মূলধন কাঠামো, সমন্বিত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, নতুন ব্যবস্থাপনা এবং আরও শক্তিশালী তদারকি।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, পৃথক পাঁচটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে একটি বৃহৎ ব্যাংকের জন্য মূলধন সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধুমাত্র পাঁচটি ব্যাংকের নাম বদলে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করলেই সংকট দূর হবে না। যদি দুর্বল সুশাসন, সম্পদের নিম্নমান, অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণের মূল কারণগুলো সমাধান না করা যায়, তাহলে নতুন ব্যাংকও একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তাদের মতে, প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে—

খেলাপি ঋণ কত দ্রুত আদায় করা যায়।
ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি কতটা উন্নত হয়।
নতুন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয় কি না।
আমানতকারীদের আস্থা কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়।
আমানতকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

বর্তমানে পাঁচটি ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এত বিপুল অঙ্কের আমানত নিরাপদ থাকবে কি না, তা নিয়ে অনেক গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ব্যাংক সফল করতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে মূলধন সহায়তা, কার্যকর তদারকি, সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন এবং কঠোর ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বাস্তব সংস্কারই হবে সফলতার মূল চাবিকাঠি।

নতুন চেয়ারম্যানের প্রত্যাশা

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান একে একটি নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থাপনা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হবে।

তার মতে, বিশ্বের খুব কম দেশেই একসঙ্গে এতগুলো সংকটাপন্ন ব্যাংক একীভূত করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্যও একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিকল্পিত সংস্কার ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নতুন ব্যাংক ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।

আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, এই একীভূতকরণ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে খেলাপি ঋণ কমানো, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং গ্রাহকদের বিশ্বাস পুনর্গঠন—এই চারটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে নতুন ব্যাংক সফল হবে, নাকি এটি আরও বড় আর্থিক ঝুঁকির উৎসে পরিণত হবে।

সান নিউজ/ জামান

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে নিউইয়র্কের উ...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে নিউমার্কেট, ব্যাহত যান চলাচল

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারী বৃষ্টিতে নিউমার্কেট ও আশপাশে...

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় ২৬ লাখ ইউরো দিলেন মেসি

ফুটবল মাঠের বাইরেও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন লিওনেল মেসি। এ...

বাংলাদেশ–ইউনান বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক...

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা