বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ও বর্ণিল ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ লগ্ন ‘মহালয়া’ আজ শনিবার। এর মধ্য দিয়েই মূলত শুরু হয়ে গেল শারদীয় দুর্গোটার ক্ষণগণনা এবং দেবীপক্ষের সূচনা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে চণ্ডীপাঠ ও বিশেষ পূজার্চনার মাধ্যমে মর্ত্যলোকে দেবী দুর্গাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
মহালয়া তিথি কেবল দেবীপক্ষের সূচনালগ্নই নয়, এটি পরলোকগত পূর্বপুরুষদের স্মরণে তর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনেরও দিন।
শাস্ত্রমতে, পক্ষকালব্যাপী পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের এই সন্ধিক্ষণে মহামায়া দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পুরাণ বর্ণনায় পাওয়া যায়, শিবের বর অনুযায়ী কোনো সাধারণ মানুষ বা দেবতা মহিষাসুরকে বধ করতে অক্ষম হওয়ায় স্বর্গচ্যুত দেবতারা ত্রয়োদশ শক্তির প্রতীক ‘মহামায়া’ বা দেবী দুর্গাকে সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে দশটি অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী দেবী টানা নয় দিনের যুদ্ধে মহিষাসুরকে পরাজিত ও পরাস্ত করেন।
মহালয়ার ভোরে নদীর ঘাট কিংবা মন্দিরে মন্দিরে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় জল ও তিল উৎসর্গ করে তর্পণ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
বিশ্বাস করা হয়, পিতৃপক্ষের এই সময়ে প্রয়াত আত্মারা মর্ত্যে আসেন এবং তর্পণের মাধ্যমে তাদের তৃপ্তি ও আশীর্বাদ কামনা করা হয়। যদিও আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, তবুও মহালয়ার এই দিনটি থেকেই মূলত চারদিকে দুর্গোৎসবের আগমনী ঘণ্টা বেজে ওঠে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। ভোরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলসহ দেশের অগণিত পূজামণ্ডপে ঘট স্থাপন, চণ্ডীপাঠ ও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মহালয়া অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনারের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জগন্নাথ হলের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, এ বছর দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং বিদায় নেবেন নৌকায় চেপে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানিয়েছেন, এ বছর সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। উৎসবকে আরও আনন্দদায়ক ও জনবান্ধব করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় গতবারের তুলনায় সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন বৃদ্ধি করেছে।
ফলে সাপ্তাহিক ছুটিসহ আগামী ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের দীর্ঘ ছুটির সুযোগ পাচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
উৎসবকে ঘিরে দেশের প্রতিটি মন্দির, প্যান্ডেল এবং মণ্ডপ এলাকায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা শিল্পীদের নিখুঁত কাজ, নয়নাভিরাম প্যান্ডেল নির্মাণ ও বর্ণিল আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে চারপাশ। সার্বিক নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও পূজা কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
আবহমানকাল ধরে চলে আসা এই দুর্গোৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা।
সান নিউজ / রাজীব