হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। ছবি: সংগৃহিত
জাতীয়
শাহজালাল থার্ড টার্মিনাল:

উদ্বোধনে ৪৪ কোটি ব্যয়, হাজার কোটি টাকার অনিয়ম

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি)-এর বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অনুমোদনহীন ব্যয়, অতিরিক্ত বিল, ভুয়া ভেরিয়েশন এবং অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

প্রতিবেদনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হওয়ার আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আংশিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থের বড় অংশই ফিতা কাটা, অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং আনুষ্ঠানিক আয়োজনের পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে, যদিও মূল চুক্তিতে এমন কোনো ব্যয়ের বিধান ছিল না।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের মূল্য প্রকল্পে অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে। কিছু গাছের দাম ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ধরা হলেও স্থানীয় নার্সারিগুলোতে একই ধরনের গাছ মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এসব গাছ কেনার জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং পরিচর্যার জন্য আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

সিএজি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প এলাকায় একটি পুকুর নির্মাণের জন্য ঠিকাদারকে প্রায় ১০ কোটি টাকা দেওয়া হলেও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই স্থানে আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে সংস্কার করেই পুকুরে রূপ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের মাটি প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ মাটি দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। এরপরও দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনের বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে অতিরিক্ত কাজের জন্য অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যয়ের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে প্রায় ২৩ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে।

এছাড়া প্রায় ৬৩০টি ভেরিয়েশন আইটেম পরিবর্তন করে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

নিরীক্ষায় আরও যেসব ব্যয়ের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়।
  • ইউপিএস সরবরাহে ৪৮ কোটির বেশি টাকা পরিশোধ।
  • জ্বালানি তেলে প্রায় ৪১ কোটি টাকা ব্যয়।
  • নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নামে ঠিকাদারকে ২১৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ।
  • চুক্তির বাইরে বিভিন্ন খাতে বিল প্রদান।
  • অপসারণযোগ্য মাটি বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ।
  • পরামর্শকদের ওভারটাইম বিল অনিয়মিতভাবে পরিশোধ।
  • ব্যয় বেড়েছে কয়েক দফায়

থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় ২০১৭ সালে এবং নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)। অর্থায়নের বড় একটি অংশ এসেছে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা থেকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মগুলোকে পরবর্তী সময়ে অনুমোদন দিয়ে বৈধতা দেওয়া হলে সেটি নতুন করে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, প্রকল্পের সব অনিয়ম নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অতিরিক্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা উচিত।

অন্যদিকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং যারা দায়ী প্রমাণিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত কিছু কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত চালিয়ে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা কঠিন হবে।

সান নিউজ/ জামান

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

মস্কোয় ইউক্রেনের বড় ড্রোন হামলা

রাশিয়ার মস্কো অঞ্চলে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে দুজন নিহত ও ছ...

ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে নিউমার্কেট, ব্যাহত যান চলাচল

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারী বৃষ্টিতে নিউমার্কেট ও আশপাশে...

জাপান সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান ও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জেনারেল...

বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩

বগুড়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় এক নারীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে হাসপাতালে নেও...

জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশি নৌ-সদস্য নিহত

দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ব...

রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর: রাতে রেলস্টেশনে ভাঙচুর

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে মধ্যরাতে রেল...

সাভারে পার্কিং করা বাসে আগুন

সাভারে পার্কিং করে রাখা ‘সাভার পরিবহনের’ একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা