জাতীয়
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ 

আশুলিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা দয়ালের ‘মাদক সাম্রাজ্য’

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরনো গডফাদাররা পালালেও তাদের শূন্যস্থান পূরণে সময় লাগেনি। স্বেচ্ছাসেবক দলের পদবি ব্যবহার করে ঢাকার আশুলিয়ায় পুরো একটি মাদক সাম্রাজ্য ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক নেতার বিরুদ্ধে।

অভিযুক্ত ওই নেতার নাম মো. আব্দুল হালিম বাবু ওরফে হৃদয় দয়াল। তিনি ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য এবং দক্ষিণ গাজীরচট আড়িয়ারা মোড় এলাকার মরহুম আহসান উল্লাহ ভাসানীর ছেলে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর চারালপাড়া ও নলীর পার এলাকার মাদক সিন্ডিকেটের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয় রিপন নামের এক মাদক কারবারি। তার মাদক সিন্ডিকেটের বাধা হয়ে দাঁড়ান স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হৃদয় দয়াল। তবে সেই ‘বাধা’ স্থায়ী হয়নি বেশি দিন। জানা যায়, মোটা অঙ্কের ‘মাসিক মাসোহারা’র বিনিময়ে তারা হাত মেলান। কিছুদিন পর রিপন একটি ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার হলে তার সিন্ডিকেট ও মাদক স্পটগুলো জোরপূর্বক নিজের দখলে নেন হৃদয় দয়াল। নিজেকে এক শীর্ষ নেতার ভাগনে পরিচয় দিয়ে পুরো এলাকায় তিনি একক আধিপত্য কায়েম করেন। মাদক স্পটগুলো চালাতে এবং এলাকার আধিপত্য ধরে রাখতে তিনি মাসিক ও দৈনিক চুক্তিতে বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাংকে নিজের ছত্রছায়ায় রাখেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয়রা আরও জানান, নিজের এই অবৈধ রাজত্ব শক্ত করতে তিনি আঁতাত করেন এলাকার কুখ্যাত মাদক কারবারি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক রাজা মোল্লার সঙ্গে। যেই রাজা মোল্লার সৎ মেয়ে ধর্ষণ মামলা, হত্যা মামলা এবং মাদক মামলাসহ অন্যান্য মামলায় বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। এমন ভয়ংকর দাগি অপরাধীদের নিয়ে বিশাল বাহিনী গড়ে তোলার পর মাদক সাম্রাজ্যে দয়ালকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সম্প্রতি মাদক কারবারিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে, ঠিক তখনই নিজেকে বাঁচাতে নতুন চাল চালারও অভিযোগ উঠেছে দয়ালের বিরুদ্ধে। জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আসা সেই রিপনের ওপরই এখন পুরো মাদক ব্যবসার দায় চাপিয়ে নিজে আড়ালে থাকার অপচেষ্টা করছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, অত্যন্ত নিখুঁত কৌশলে কমিশন ও মাসিক চুক্তিতে বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। নলীর পার মাঠে মাদক বিক্রির দায়িত্বে আছেন আরিফ, চারালপাড়া সংলগ্ন লাল পাহাড় মন্দির মাঠে আছেন লিমন এবং ওয়েস্টার্ন ফ্যাশন এলাকার ডাবতলা মার্কেটের মাদক সিন্ডিকেট চালান ইমন নামের এক যুবক। যারা সবাই দয়ালের বিশ্বস্ত। এদের তিন গ্রুপে ১০ থেকে ১২ জন কিশোর গ্যাং সদস্য রয়েছে। সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন মুন্না। দৈনিক এক থেকে দেড় কেজি গাঁজা বিক্রি করেন, যা থেকে আনুমানিক লাভ হয় ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা। এছাড়াও দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ পিস ইয়াবা বিক্রি করে তার সিন্ডিকেট, যেখান থেকে তাদের লাভ হয় ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। সেই হিসেবে মাসে গাঁজা বিক্রি থেকে লাভ হয় ১৫ লাখ থেকে ২১ লাখ টাকা এবং ইয়াবা থেকে লাভ হয় ৯ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা।

দৈনিক হাজিরায় মাদক বিক্রি করা দুলাল জানান, "আমি আগে তার মাল (মাদকদ্রব্য) বিক্রি করতাম। এখন করি না। আমি যেন তার মাল বিক্রি করি, এজন্য বারবার হুমকি দিচ্ছে। আজকেও বারবার আমাকে হুমকি দিচ্ছে তার পক্ষে একটা ভিডিও করে দেওয়ার জন্য। বর্তমানে আমি তার ভয়ে এলাকার বাইরে আছি।

কী ধরনের ভিডিও চাচ্ছে? জানতে চাইলে দুলাল বলেন, তিনি একজন ভালো লোক, তার সাথে মাদক ব্যবসার কোনো সম্পর্ক নেই, আমি তার হয়ে মাদক ব্যবসা করতাম না-এ ধরনের একটি ভিডিও চাচ্ছে।

হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ডে রিকশাচালককে মাদক বহনের জন্য সরাসরি চাপ দিচ্ছেন স্বয়ং হৃদয় দয়াল। সেখানে ওই চালক অপরাধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আকুতি করে বলেন, “আমি ভাই এটার প্রতি থাকতে চাই না। কাজ কাজই, কর্ম কোনো সময় ছোট না। আপনারা বড় মানুষ রাজনীতি করবেন, আর আমি ছোট মানুষ।”

এ বিষয়ে কথা হয় রিপনের মা কুলসুম বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, "আমার ছেলে আগে মাদক ব্যবসা করতো, সামাজিকভাবে আমার মান-সম্মান শেষ করে দিয়েছে। তাই পোলারে আমি নিজে অ্যারেস্ট করাইছি। ঘরের দরজা কাটাইয়া ঘরের সব তছনছ কইরা ভাঙচুর করছি, দারোগাকে আইনা হ্যান্ডকাফ লাগাইয়া এলাকাবাসীর সামনে পুলিশে ধরাইছি। পরে ও (রিপন) বন্ডসই (মুচলেকা) দিছে মাদক বিক্রি করবে না। যদি আমার পোলার নামে কেউ মাদক বেচে, ধইরা সাথে সাথে চালান দিবেন। এখন বাবুর নেতৃত্বে মাদক বেচে রাজা মোল্লা, আরিফ, ইমন, লিমন। খোদ বাবুর বাসার সামনেই এখন মাদক বেচাকেনা হয়।"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ বাইপাইল এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, সন্ধ্যার পর পরই এলাকার ভেতরে হৃদয় দয়ালের বাহিনীর তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। মহল্লার প্রতিটা অলিগলিতে তার নির্দিষ্ট লোক থাকে মাদক বিক্রি করার জন্য। তাদেরকে দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা হাজিরা দেওয়া হয়। তার লোকদের মধ্যে কেউ দৈনিক হাজিরায় মাদক বিক্রি করতে অস্বীকার করলে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।শুধু মাদকই নয়, এই ‘দয়াল’ নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে অস্ত্রবাজি ও নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ।

সম্প্রতি চারালপাড়ার এক ব্যবসায়ীকে সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে মীমাংসার নামে তার কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। এর আগে প্রকাশ্যে এক নারীর ওপর হামলা এবং নবীনগর এলাকায় চাঁদাবাজি করতে গিয়ে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন এই হৃদয় দয়াল।

এতসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মো. আব্দুল হালিম বাবু ওরফে হৃদয় দয়ালের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি প্রতিবেদককে তার অফিসে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তার অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান অভি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অভিযুক্ত দয়ালের সাথে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, “আমাদের দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতিপূর্বেই সে বহিষ্কার হয়ে রয়েছে। সে আমাদের দলের কেউ না। সুতরাং এই বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নাই।”

ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান বলেন, ‘অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নতুন করে আসা সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের অতি দ্রুত আবারও আইনের আওতায় আনা হবে।’

উল্লেখ্য যে, গত বছরের ২৬ মার্চ জাতীয় স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে গেলে ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক বদরুল আলম সুমনের ওপর হামলা চালায় একটি গ্রুপ। সেই হামলার সাথে আব্দুল হালিম বাবু ওরফে হৃদয় দয়াল জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ (শুক্রবার) তার বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভ মিছিল করেন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক বদরুল আলম সুমনের সমর্থকরা।

এরপর গত বছরের ২৩ এপ্রিল মোহাম্মদ আলী আকবর হোসেন নামে এক ইলেকট্রিক কনট্রাক্টরকে কৌশলে জঙ্গলে নিয়ে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়াসহ আট হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা জেলা কমিটির সদস্য মো. হালিম বাবু ওরফে দয়ালের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই তাকে বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পরবর্তীকালে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা জেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল হালিম বাবুকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই সাথে দলের নেতাকর্মীদের তার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়।

এরপরে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি তাকে পুনরায় স্বপদে বহাল করে একটি নোটিশ জারি করা হয়।

সান নিউজ/ জামান

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে নিউইয়র্কের উ...

ড্রোন হামলার মধ্যেই রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের দলের জয়

রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট দুমার নির্বাচনে সহজ জয়ের পথে রয়েছে দেশট...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় ২৬ লাখ ইউরো দিলেন মেসি

ফুটবল মাঠের বাইরেও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন লিওনেল মেসি। এ...

বাংলাদেশ–ইউনান বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক...

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা