মো. কামাল হোসেন: বিশ্বায়ন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দাপটের যুগে বাংলাদেশে সাংবাদিকতাকে বহুমূখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এর অন্যতম হলো, সংবাদ মাধ্যমকে সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিনত করার প্রবনতা দেশ জুড়ে প্রবলভাবে চলে আসছে। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ সংবাদ মাধ্যমের নেই পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি। অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই জেলা, উপজেলাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি। আর নেই বেতন-ভাতাসহ কর্মীর সুযোগ সুবিধা দেওয়ার প্রবনতা। সর্বত্র চলছে কপি-পেস্টের প্রতিযোগিতা।
আরও পড়ুন: পদ্মা সেতু ঘিরে বাস তৈরির ধুম
এর ফলে সংবাদ মাধ্যমে যারা ভাল কাজ করছেন, তারা অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপারে হলো, বার্তা কক্ষে তৈল মর্দন ও নোংরা রাজনীতির কারণে যারা ভাল কাজ করছেন, তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এতে সৃজনশীল গণমাধ্যমের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সমস্যা তৈরি পেছনে রয়েছেন, শুধু মাত্র তেল মারার যোগ্যতা দিয়ে বড় পদ দখল করা অর্বাচীন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করে, সে ও তার আত্মীয় ছাড়া এই জগতে বুঝি যোগ্য কেউ নাই। তাই তো নিজে সম্পাদক হলে বউ-ছেলে-মেয়েসহ নিকট আত্মীয়কে বানান নির্বাহী সম্পাদকসহ আরও কত কি! যাদের আবার জীবনে সংবাদ তৈরি-প্রচার তো দূরের কথা সংবাদ পড়া বা দেখার রেকর্ডও নাই।
এছাড়া আধুনিক যুগে বিশ্বময় সংবাদ পৌঁছানোর অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে কার্যকর নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যথেষ্ট সফলতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে টাউট-বাটপারসহ যে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র অনলইন নিউজ পোর্টাল চালু হচ্ছে। এই সকল পোর্টালে নেই তেমন দক্ষ জনশক্তি। ফলে যেনতেন ভাবে সংবাদ প্রকাশ করার কারণে সাংবাদিকতার নৈতিকতা বিরোধী কাজ হরহামেশা ঘটছে। এমন কি বেশিরভাগ গণমাধ্যমে নেই কর্ম ও আর্থিক নিশ্চয়তা। এতে ভেতরে-বাহিরে সবচেয়ে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পরিনত হয়েছে সাংবাদিকতা।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জয়জয়কারের যুগে গতানুগতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সংবাদ তৈরি ও প্রচারের বহুমুখী পদ্ধতি ও চিন্তার ব্যাপকতা বেড়েছে। বেড়েছে প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। সেই অনুযায়ী উপর থেকে নিচে (টপ টু বটম) দক্ষতার প্রভাব পড়েনি। তাই পাঠক চাহিদা অনুযায়ী ভাল সংবাদ তৈরি ও প্রচার সঠিকভাবে হচ্ছে না। এতে পাঠক প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানেরও কাঙ্খিত উন্নয়ন না হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে। এছাড়া সংবাদ মাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতা প্রশ্নের চরমভাবে সম্মুখীন। সমাজে প্রচলিত আছে, এক সময় মানুষ সত্য জানার জন্য সংবাদ মাধ্যমের দিকে তাকিয়ে থাকতো, আর বর্তমান যুগে সংবাদে প্রকাশিত ঘটনাটি সত্য কিনা, তা জানতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুঁজতে থাকে!
আরও পড়ুন: ‘ঐতিহাসিক ভুল’ করেছেন পুতিন
এছাড়া গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও আইনজীবীসহ অন্যান্য পেশার মত কেন্দ্রীয়ভাবে মেধা যাচাই, নিবন্ধন ও নিয়োগ ব্যবস্থা না থাকায়, যে কেউ, যখন খুশি এ পেশায় চলে আসতে পারছে। ফলে সাংবাদিক পরিচয়ে মাদক ব্যবসা, ঘুস বাণিজ্য, ভূমি দস্যুতা, চাঁদাবাজিসহ ঘটেছে নানারকম অপকর্ম। এতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাংবাদিকতা। আর অসৎ লোকেরা এই সুযোগে মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল, আয়কর ফাঁকিসহ তাদের অবৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সাংবাদিকতা পেশাকে অত্যন্ত নগ্নভাবে ব্যবহার করে চলেছে। এর মধ্যে সমাজে একটি কথা প্রবাদ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, ‘আগের দিনে সম্পদ পাহারা দিতে, কয়েকজন লাঠিয়াল ও কুকুর পুষতো, আর আধুনিক যুগে একই কাজ করতে সংবাদ মাধ্যম পুষে।’ কথাটি অপমানজনক হলেও বাস্তবতা তো আর অস্বীকার করা যায় না। তবে ব্যতিক্রমও আছে।
আরও বিপজ্জনক ব্যাপারে হলো, এক শ্রেণির রাক্ষুসী সাংবাদিক আছেন, যারা বড় বড় সাধু ও অসাধু ব্যবসায়ীকে নিয়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেন। এতে তিনি নিজে নেন লাখ লাখ টাকা আর তার অধীন কর্মীকে দেন নামে মাত্র হাজার টাকা। তাও আবার ঠিক মতো পাওয়ার নেই কোনো নিশ্চয়তা। ওই সমস্ত গণমাধ্যমে নেই সরকার ঘোষিত বেতন কাঠামো। এ ক্ষেত্রে সব চেয়ে বঞ্চনার শিকার হলেন জেলা-উপজেলায় কাজ করা সংবাদকর্মীরা। হাতে গোনা কয়েকজন বেতন পেলেও বাকিদের চাঁদাবাজির উপর নির্ভর করে চলতে হয়। চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারার জন্যই জেলা-উপজেলায় একাধিক প্রেস ক্লাব তৈরি হচ্ছে। আবার কোনো কোনো গণমাধ্যমে বেতন-ভাতা দেয় না, উল্টো প্রতিনিধি হতে ও আইডি কার্ড পেতে টাকা দিতে হয়। এছাড়া জেলা-উপজেলাসহ সর্বত্র সরকারি গণমাধ্যম সংক্রান্ত নানারকম অনুমোদন ও বিজ্ঞাপন পেতে ঘুস দেয়া-নেয়া এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়।
আরও পড়ুন: প্রেমের টানে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি
এই সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো চরম হাস্যকর সংস্থায় পরিনত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে ব্যাকেট বন্দি সংগঠনগুলো সংবাদ মাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখার পরিবর্তে তেলবাজি করে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের কারও কারও কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো আরেকজন সাংবাদিক। তারা কেউ এমন ভাব করেন সাংবাদিকতা তাদের রাজনীতির হাতিয়ার মাত্র। এর প্রতি নেই তাদের কোনো সম্মান। কেউ কেউ তো কে কোন দলের সবচেয়ে বড় চামচা তার একটি রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে বসেন। সম্প্রতি একজন সাংবাদিক নেতা জানিয়েছেন, সাংবাদিক সংশ্লিষ্ট ২৩৪টি সংগঠনের নাম তিনি পেয়েছেন। যারা ইফতার পাটি ও পিকনিক করা ছাড়া সংবাদ কর্মীদের দক্ষতা ও অধিকারে আদায়ে কোনো ভূমিকা রাখছে না। বহুধা বিভক্ত ওই সংগঠনগুলো দেশব্যাপী বহু অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, রাতের অন্ধকার কেটে যেমন দিনের আলো প্রস্ফুটিত হয় তেমনি, সাংবাদিকতায়ও অন্ধকার যুগের অবসান হবে। সাংবাদিকতা থেকে ঝরে পড়বে টাউট-বাটপার শ্রেণি। ফিরে আসবে সুদিন। সঠিক জনবল কাঠামো নিয়ে গড়ে উঠবে আধুনিক সাংবাদিকতা। সেদিন হয় তো তৈলবাজির পরিবর্তে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষক ও আইনজীবীদের মতো পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ/লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে জনবল গড়ে উঠবে। এতে কর্ম মূল্য নিয়ে থাকবে না হাহাকার। সময় মতো যার যা প্রাপ্য পেয়ে যাবে। থাকবে কর্মের নিশ্চয়তা, আর সেদিন বহুমূখী সংবাদ তৈরি ও প্রচার পদ্ধতি নিয়ে গড়ে উঠবে অত্যাধুনিক সাংবাদিকতা। সব কিছুর যেমন শেষ আছে, তেমনি অন্ধকার ভেদ করে একদিন আলো আসবেই।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক
ই-মেইল: kamalhossainjnu@gmail.com
সান নিউজ/কেএমএল