সম্প্রীতি
মতামত

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিপন্নতায় বিপদে স্বদেশ

অজয় দাশগুপ্ত

সম্প্রীতি বাংলাদেশের জীবনের অঙ্গ বলেই জানতাম। এতোদিন সেটাই বিশ্বাস করে এসেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখা মানুষ। বালক বেলার সে সময়কাল আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল । এখন এ কথা বলতেই পারি পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক হলেও মানুষ ছিল অসাম্প্রদায়িক। তারা তখন বাঙালি হবার সংগ্রামে ব্যস্ত। তখন পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় একটা শ্লোগান চোখে পড়তো, একটি বাংলা বর্ণ একজন বাঙালির জীবন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের এমন ধারাবাহিকতা আজ বিলুপ্ত। স্বাধীন দেশে আমরা বড় হয়েছিলাম নানা কষ্ট আর বেদনা নিয়ে। আমাদের আমলে না ছিল এতো শান-শওকত, না এতো সব সম্ভার। আমরা মোবাইল-ইন্টারনেট-ডিজিটাল যুগ দেখিনি। আমাদের সাধারণ খুব সাদামাটা জীবনে মানুষে মানুষে ছিল মায়া-মমতার অভিন্ন বন্ধন। আমাদের টাকা-পয়সার ঘাটতি ছিল বটে, ছিল না এতো উচ্চাশা। এতো খাই খাই ভাব ছিল না সমাজে।

অথচ আমাদের জীবন কেটেছে সেনা শাসনে। জিয়াউর রহমান এবং তারপরে এরশাদের মতো একনায়ক ছিল দেশ শাসনে। এরশাদ দেশ চালাতেন তার ব্যক্তিগত মর্জি মাফিক। তাই যখন তার যেটা দরকার সেটাই করতেন। আমাদের জীবনে উপদ্রব আর বন্ধ বাতায়নের জনক এরশাদকে হটাতে কত আন্দোলন, আর কত ত্যাগ! আশা একটাই, এদেশে গণতন্ত্র আসবে। গণতন্ত্র এসেছে কিনা এটা তর্কের বিষয়, তবে খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনার আমলে আমরা মোটামুটি একটা মুক্ত আকাশের তলায় দাঁড়ালাম। গত কিছু বছর থেকে আমরা উন্নয়নের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। শুনতে পাই এ নিয়ে অজস্র গল্প। সে গল্প আর ধারাবিবরণীতে বিশ্বাস করতে করতে মনে করেছি সত্যি দূর হয়ে গেছে যাবতীয় জঞ্জাল। এদেশে আর যাই হোক মৌলবাদের থাবা আর আমাদের কলঙ্কিত করতে পারবে না।

সে বিশ্বাস এবার নষ্ট হয়ে গেছে শারদীয়া পূজা ঘিরে শয়তানের তাণ্ডবে। গেল বছর কোভিড মহামারীর জন্য ভালো করে পূজা করতে পারেনি
হিন্দু জনগোষ্ঠী। এবারও সংশয় ছিল। কোভিড মুক্ত হয়নি বিশ্ব এখনো। ফলে লকডাউনের ভয়, বিধিনিষেধের কড়াকড়ি থাকতেই পারতো। কিন্তু এবার তা ছিল না। কোভিড সংক্রমণের শিকার হলে সেটাকে ভাগ্য বলে মেনে নিবে ধরে নিয়ে জাঁকজমকের সাথে পূজা উদযাপনে মন দিয়েছিল হিন্দুরা। কিন্তু কুমিল্লার এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। ধরে নিয়েছিলাম এ আর এমন কি। এমন তো হয়ই। সরকার প্রশাসন আর জনগণ মিলে প্রতিহত করবে। এক দুই ঘণ্টার ভেতর থেমে যাবে এদের তাণ্ডবলীলা। কিন্তু থামেনি। পরেরদিন আরো ব্যাপকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এরা। কুমিল্লাসহ দেশের বহু এলাকায় পরিবেশ হয়ে উঠেছিল নারকীয়। আশ্রম মন্দির মঠের ব্যাপক ধ্বংস লীলা, নারীদের অত্যাচার এমনকি ধর্ষণ ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

সরকারের আন্তরিকতা বা আদেশ কোনটাই গায়ে মাখেনি এরা। এতোদিনের সম্প্রীতি আর বন্ধন এক নিমিষে ছারখার হয়ে গেছে। এখন যতই বলা হোক বিচ্ছিন্ন বা আলাদা ঘটনা, আসলে তা সত্যি নয়। এরা ঘাপটি মেরে ছিল। শুক্রবার দিনটিকে বেছে নিয়েছিল যাতে সমবেত হয়ে একসাথে হামলা করতে সুবিধা হয়। একের পর এক জেলায় আক্রমণের খতিয়ান আর কৌশল দেখলেই বোঝা যায় আক্রোশ কোথায়।
এরইমধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলে দিয়েছেন, “এসব আক্রমণের পেছনে নাকি বিএনপি ছিল। বিএনপির ইন্ধনে ঘটেছে এসব।” এ ধরনের বিবৃতি একেবারেই অজানা বা আশ্চর্যজনক কিছু না। বাস্তবতা এটাও বলে দেয় বিরোধী দলগুলোর সংশ্লিষ্টটতা থাকতে পারে। কিন্তু একতরফা এমন দোষারোপ কি সমস্যা সমাধানে সহায়ক? না এতে সমস্যার মূলে যাওয়া সম্ভব? বিএনপি বা উগ্রবাদীরা তো আওয়ামী লীগের ভাষ্য মতে ‘মাজা ভাঙ্গা’, ‘হাঁটু ভাঙ্গা’। তাদের তো ‘সাইজ’ করা হয়েছে বলেই আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মহল দাবি করে। তাহলে এই শক্তি তারা পেল কোথায়? আর একটা বাস্তবতা ভুললে চলবে না। এখন দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দল আছে? বা তাদের শক্তি আছে ? সবই তো সরকারি দলের হাতে। তাদের কর্মী বা সমর্থকদের ছাড়া এমন কুকাজ কি আদৌ সম্ভব হতো?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এমন কুকর্মের সাথে যখন সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি জড়িত তখন কোথায় ছিল গোয়েন্দা সংস্থা? তারা কি জানতো না? না জেনেও চেপে গেছে? প্রশ্ন কোথায় ছিল আওয়ামী বাহিনী? কোন কোন জায়গায় থেমে থেমে কয়কদফায় হামলা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি প্রতিরোধে। চট্টগ্রামের মতো বৃহত্তম শহরের প্রাণকেন্দ্রে জে এম সেন হলের হামলায় এটা পরিষ্কার ওরা তৈরি হয়ে মাঠে নেমেছিল। আপনি ভালো করে দেখলেই বুঝবেন মোটিভ কি ছিল। শুধু মূর্তি টার্গেট হলে ওরা দোকানপাটে হামলা করতো না। উগ্রবাদীদের এ হামলায় প্রশ্ন জেগেছে আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ আর আমাদের প্রার্থিত বাংলাদেশে আছি? তাও আওয়ামী লীগের আমলে? একশব্দে ‘হ্যাঁ’ বলার সব সম্ভাবনা শেষ করে দিয়ে গেছে এই ঘটনা।

যে যেভাবে যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুক, স্বীকার করুক আর নাই করুক- বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি বা সহাবস্থান দিনদিন ঠুনকো হচ্ছে। ইউটিউবসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেসব ভিডিও তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার- তারুণ্য আজ বিভ্রান্তির চরমে। দ্বন্দ্বে আছে আদৌ বাঙালি ধাকবে, না থাকবে না? হিন্দুদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার জের ধরে কিন্তু বলাই যায় দেশ ও সমাজের বিকৃতি না সারালে আমরা যে পথে এগোচ্ছি তাতে রাষ্ট নিজেই সংকট এড়াতে পারবে না। মোসাহেব বুদ্ধিজীবীরা মানুক, আর না মানুক- মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আজ আবার বিপন্ন। এই বিপন্নতা থেকে মুক্তি কোথায়?

বিডিনিউজ২৪ অনলাইন পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে নিউইয়র্কের উ...

ড্রোন হামলার মধ্যেই রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের দলের জয়

রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট দুমার নির্বাচনে সহজ জয়ের পথে রয়েছে দেশট...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় ২৬ লাখ ইউরো দিলেন মেসি

ফুটবল মাঠের বাইরেও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন লিওনেল মেসি। এ...

বাংলাদেশ–ইউনান বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক...

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা