তারেক রহমানের চীন সফর আবারও মনে করিয়ে দিল- বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইতিহাস শুধু দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস নয় বরং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। আদতে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মাটির রাজনীতিটা বুঝেছিলেন, আর মাটি আর মানুষের এই রাজনীতিই তিন হাজার বছরের চীনা দর্শনের মূল ভিত্তি।
মাও একদা বলেছিলেন, ক্ষমতা জন্মায় বন্দুকের নল থেকে। ১৯৭৫-এর বাংলাদেশ সেই বাক্যের এক করুণ সত্যায়ন দেখেছে কেননা স্বাধীনতার অব্যবহিতকালে বাংলাদেশের ক্ষমতার উৎস জনগণ ছিল না- ছিল রাজনৈতিক পরিচয়পত্র।
এই পরিচয়-রাজনীতিই জন্ম দিয়েছিল এক কায়েমি স্বার্থের ক্লিপ্টোক্র্যাসি।
জিয়াউর রহমান এই বৃত্ত ভাঙলেন- বন্দুক নয়, কোদাল হাতে নিয়ে। ক্ষমতাকে তিনি ফেরালেন তার আদি মালিকের কাছে- জনগণের কাছে।
চৈনিক কনফুসিয়ান রাজনৈতিক দর্শনে, এই জনগনকেন্দ্রীকতাকেই বলে- ‘মিনবেন’।
মিনবেন-এর ভিত্তির ওপর দাঁড়ায় ‘রেন’- শাসকের ইনসাফ আর মানবিকতায়।
রেন-এর চূড়ান্ত পরীক্ষা গিয়ে মেশে জনগণের আস্থায়-’মিনসিন’-এ।
তিন হাজার বছরের এক প্রাচ্য প্রজ্ঞা, যা জিয়া বই পড়ে শেখেননি- মাঠে হেঁটে শিখেছিলেন।
মিনবেন: গ্রামই বাংলাদেশ-“বাংলাদেশ মানে গ্রাম”- এই একটি বাক্যেই জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন ধরা।
রাজধানীর বাতিতে জাতির ভাগ্য বদলায় না, বদলায় কৃষকের কোদালে। তাই ১৪,০০০ খাল কাটালেন- ফরমান জারি করে নয়, কোদাল হাতে। জামানতবিহীন ঋণ, সহজ সার-বীজ, ধান-গবেষণা- ফলাফল: খাদ্যের জন্য হাত পাতার বাংলাদেশের আত্মনির্ভরতার লড়াইয়ে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সংগ্রামে এগিয়ে গেলো অনেকটাই।
গ্রাম সরকার গড়ে ক্ষমতাকেও তিনি বিকেন্দ্রীভূত করলেন। শাসন হলো দূরের প্রাসাদ-নির্দেশে নয়, দাওয়ায় বসা প্রতিবেশীর কথা।
রেন : যোগ্যতাই একমাত্র পরিচয়-বাকশালের ছাই থেকে তিনি ফিরিয়ে আনলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের কলম। কিন্তু রেন-এর আসল পরীক্ষা ছিলো প্রতিপক্ষকেও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মেনে নেওয়ায়। কোনো একটি দলকে রাষ্ট্রের সমার্থক না বানিয়ে তিনি সব দলকেই রাজনীতি করার অধিকার দিলেন- বাম, ডান, ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী-বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারাকে আবার রাজনীতির পরিসরে ফিরিয়ে আনলেন; সভা-মিছিল ও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথও ক্রমে উন্মুক্ত হলো। জিতুক বা হারুক, প্রতিটি কণ্ঠ যেন শোনা যায়, এই ছিল জিয়ার নীতি।
রাজবন্দীদের মুক্তি, নির্বাসিত রাজনীতিকদের দেশে ফেরার পথ খুলে দেওয়া- এসবও সেই একই নীতির অংশ। এ’ নিছক আইন বদল নয়- দমনের রাষ্ট্র থেকে মানবিক রাষ্ট্রে এক দুঃসাহসী উল্লম্ফন।
আর রাষ্ট্রের ভেতরেও জাত,বংশ, ধর্ম, বর্ণের পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতাকে নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি করার চেষ্টা ছিল তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার একটি বৈশিষ্ট্য। প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় মানুষ বসল পরিচয়ের জোরে নয়, দক্ষতার জোরে। যোগ্য মানুষ পেল যোগ্য আসন!
প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি সরিয়ে দক্ষতার মাপকাঠি বসানো ছিল এক নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী সংস্কার, যা রাষ্ট্রযন্ত্রকে করে তুলল অপেক্ষাকৃত পক্ষপাতহীন। এটাই রেন- শাসক মানুষকে বিচার করেন তার কাজে, ইনসাফের সাথে।
নারী-শিশু মন্ত্রণালয়, সাড়ে সাতাশ হাজার গ্রাম-চিকিৎসক, গণশিক্ষা আন্দোলন- এসব প্রতীক নয়, দায়বদ্ধতার দলিল। বাজার খুললেন, অথচ মানুষকে ফেলে গেলেন না- পোশাকশিল্প ও প্রবাসী কর্মসংস্থানের বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে লাখো পরিবারের রুটি-রুজির পথ খুললেন। প্রবৃদ্ধি আর ন্যায্যতা- এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষ্যকে একসুতোয় বাঁধা তাঁর দূরদর্শিতারই ফসল।
মিনসিন : বিশ্ব যাকে আস্থায় নিয়েছিল- মিনসিন শুধু গ্রামের হৃদয় জয় নয়- একটি জাতির প্রতি বিশ্বের আস্থাও। ‘জিয়ার বাংলাদেশ’ মানচিত্রের কোনায় পড়ে থাকেনি। মাত্র কয়েক বছর আগে জন্ম নেওয়া, দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধবিধ্বস্ত ‘বটমলেস বাস্কেট’ নামে অভিহিত এক রাষ্ট্র, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী আসন জিতে গেল, তাও জাপান কে পেছনে ফেলে!
ওআইসি ও আল-কুদস কমিটিতে সরব উপস্থিতি, ফিলিস্তিন প্রশ্নে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান, মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্যতা গড়ে তোলা- এসব কোনো প্রতীকী কূটনীতি ছিল না, ছিল এক নতুন রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের সচেতন কৌশল।
ফলও এলো হাতেনাতে- বৈদেশিক বিনিয়োগ, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার, উন্নয়ন-সহযোগিতার দুয়ার একে একে খুলল।
আর কূটনীতি মানে শুধু করমর্দন নয়- ফল আদায়ও।
বহু বছরের অমীমাংসিত গঙ্গার পানি বণ্টন প্রশ্নকে তিনি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আড়াল থেকে টেনে এনে জাতিসংঘ পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন, আন্তর্জাতিক চাপে ভারতকে বাধ্য করলেন সমঝোতায় আসতে- একটি ছোট, নবীন রাষ্ট্রের পক্ষে এক বড় প্রতিবেশীকে টেবিলে বসতে বাধ্য করা অলীক না হলেও দু:সাধ্য তো বটেই!
একইভাবে ১৯৭৮ সালে যখন লাখো রোহিঙ্গা বার্মার নিপীড়ন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল, জিয়া কূটনৈতিক তৎপরতায় বার্মাকে বাধ্য করলেন আলোচনার টেবিলে বসতে এবং সকল শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে।
একটি সদ্য-স্বাধীন, দরিদ্র রাষ্ট্র প্রতিবেশী দুই আঞ্চলিক শক্তিকে টেবিলে বসিয়ে নিজের শর্ত আদায় করেছে- এই সক্ষমতাই বলে দেয়, বিশ্ব তাকে খাটো করে দেখেনি।
দেশের ভেতরে জনগণ তাঁর নাম দিয়েছিল ‘জনগণের রাষ্ট্রপতি’। দেশের বাইরে বিশ্ব তাকে দিয়েছিল আসন, কণ্ঠ, দর কষাকাষির ক্ষমতা।
ঘরে-বাইরে একই আস্থা- এটাই মিনসিনের পূর্ণ রূপ।
মিনবেন কোনো অনূদিত তত্ত্ব নয় জিয়ার কাছে- এটি ছিল তাঁর একান্ত রাজনীতি।
ইতিহাস উত্তর দিয়ে দিয়েছে সেই প্রশ্নের- জনগণকে কেন্দ্রে রাখলেই রাষ্ট্র দাঁড়ায়, নইলে ধ্বসে পড়ে।
এ’ দেশের মাটির সোঁদা গন্ধমাখা এই রাজনৈতিক পাঠই জিয়াউর রহমানের রাজনীতির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার।
লেখক : অজেয় রোহিতাশ্ব আল্ কাযী
প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক