আন্তর্জাতিক

ইরানে ভয়াবহ পানি সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে তীব্র পানি সংকট এবং বিদ্যুতের সঙ্কট নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদ বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটেছে গেল মাসের শেষ দিকে। তাতে একজন বিক্ষোভকারী গুলিতে নিহত হয়েছেন। সূত্র : বিবিসি

এই সঙ্কটের জেরে দেশটিতে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির বিভিন্ন শহরে। বিশেষজ্ঞরা ইরানের পানি পরিস্থিতি নিয়ে বহু বছর ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। তাহলে পরিস্থিতি এই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছল কেন ও কীভাবে?

অতি শুষ্ক বছর

এপ্রিল মাসে ইরানের আবহাওয়া দপ্তর "নজিরবিহীন খরা" সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দেয় এবং জানায় যে দীর্ঘ মেয়াদে গড়পড়তা বৃষ্টিপাতের হারের থেকে বৃষ্টি হয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম।

খুজেস্তান প্রদেশ, যেটি তেল উৎপাদনকারী এলাকা। সেখানকার বাসিন্দারা পানির সঙ্কট নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে পথে নামে। অন্যান্য শহরগুলোতে বিক্ষোভ হয় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে তৈরি বিদ্যুতের সরবরাহ হ্রাসের বিরুদ্ধে।

সরকার সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে পড়া এলাকাগুলোয় জরুরি সহায়তা পাঠায়। ইরান এখন অতিরিক্ত তাপমাত্রা, দূষণ, বন্যা এবং হ্রদ নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাওয়ার মতো বিশাল পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। রয়েছে আরও নানা চ্যালেঞ্জও।

'আমি তৃষ্ণার্ত'

খুজেস্তান প্রদেশে চলছে তীব্র খরা। খরায় বিপর্যস্ত স্থানীয় মানুষ পথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে- অনেকের কণ্ঠে স্লোগান ছিল "আমি তৃষ্ণার্ত!" এই অঞ্চলে আগে পানির কোন অভাব ছিল না। ওই প্রদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত কারুন নদীতে প্রচুর পানি ছিল। এখন সেই নদী বেশিরভাগ সময়ই শুকনো । উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, এই নদীর পানি গত বছর ক্রমান্বয়ে কমেছে। জার্মানির স্টুটগার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগৃহীত তথ্য উপাত্তে খুজেস্তানের খরার এই চিত্র দেখা গেছে।

সেখানে নদীপ্রবাহে ২০১৯ সালে একটা স্ফীতি দেখা গিয়েছিল, কিন্তু তার কারণ ছিল ব্যাপক বন্যা। খুজেস্তান প্রদেশের এই সরকারি মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে ২০২১ সালের জুলাই মাসে এলাকার বাঁধগুলোতে পানির মাত্রা কতটা। হালকা নীল রং-এ আঁকা রেখা পানির মাত্রা কোথায় তা ইঙ্গিত করছে।

বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ বাঁধগুলোতে বর্তমানে পানির স্তর খুবই নিচে নেমে গেছে। এই বাঁধগুলোর নিচের এলাকায় ধান চাষ ও গবাদি পশুর জন্য সংরক্ষিত পানি ছেড়ে দেবার জন্য দাবি ক্রমেই বাড়ছে।

পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে গেল কীভাবে?

কেউ কেউ বলছে এর জন্য দায়ী তেল উৎপাদন শিল্প। তাদের যুক্তি পরিবেশের ভারসাম্য ব্যাহত হয়েছে তেল উৎপাদন শিল্পের জন্য। অনেকে বলছে বর্তমানের খরা পীড়িত এই এলাকাগুলো থেকে দেশটির মধ্যাঞ্চলে মরু এলাকায় পানি টেনে নেয়ার কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। "জলবায়ু পরিবর্তন এবং খরা এই পরিস্থিতির প্রধান অনুঘটক,'' বলছেন ইরানের পরিবেশ দপ্তরের সাবেক উপ প্রধান কাভে মাদানি। বর্তমানে তিনি কাজ করেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

"তবে সমস্যার শিকড় আরও অনেক গভীরে। কয়েক দশক ধরে অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত বিষয়গুলো নিয়ে পর্যালোচনা ও দূরদৃষ্টির অভাব এবং এরকম একটা পরিস্থিতি যে হতে পারে তার জন্য কোনরকম আগাম প্রস্তুতি না রাখা এখন পরিস্থিতিকে এরকম ভয়াবহ করে তুলেছে," বলছেন মি. মাদানি।

পানি সঙ্কট আরও গুরুতর হয়ে উঠছে

ইরানে পানি সরবরাহের স্বল্পতা ক্রমশই গুরুতর হচ্ছে, যা দেশটির জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ। ইরানে প্রায়ই খরা হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন দেশটির আবহাওয়ায় চরম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়ায় অতিমাত্রায় বদল ঘটছে।

আবহাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে ওঠায় জলবিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর এর বড়ধরনের প্রভাব পড়ছে। এবছর গ্রীষ্ম মরশুমে ইরানে তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট দেখা গেছে। অনেক সময় শহরগুলো ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকারে ডুবে থেকেছে। গত মাসের শুরুতেই তেহরান, শিরাজ এবং ইরানের অন্যান্য শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মানুষকে চিৎকার করে বলতে শোনা গেছে "স্বৈরশাসকের মৃত্যু চাই"এবং "খামেইনির মৃত্যু চাই"। সরকার বিদ্যুৎ ঘাটতির জন্য তীব্র খরা ও উচ্চ চাহিদার দোহাই দিয়ে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।

সেসময় প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি টেলিভিশনে বলেছেন, খরার কারণে দেশের অধিকাংশ জলবিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রগুলো কাজ করছে না। প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে এয়ারকন্ডিশনিং-এর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

দীর্ঘ মেয়াদী পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা

খরার কারণে ইরানে পরিবেশগত বিশাল একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইরানের পানি সঙ্কটের পেছনে অন্য কারণও রয়েছে। একজন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ২০১৫ সালে সতর্ক করে দিয়েছিলেন ইরান যদি তার পানি সঙ্কট সমাধান না করে, তাহলে লক্ষ লক্ষ ইরানী গণহারে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে। ইরানের পরিবেশ বিভাগের প্রধান মাসুমে এবতেকার পানি সমস্যা সমাধান করতে "কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লবের" আহ্বান জানিয়েছেন।

লবণাক্ততা ও শহর বসে যাওয়ার সমস্যা

ভূপৃষ্ঠের নিচে শিলাস্তরে পানি জমা থাকে। ইরানে পানির একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই সঞ্চিত জলাধার। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এই সঞ্চিত পানির স্তর বিপদজনকভাবে নেমে গেছে। বিশ্বের যেসব দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেছে তার মধ্যে ইরান ছাড়াও রয়েছে ভারত, আমেরিকা, সৌদি আরব আর চীন।

জাতীয় পর্যায়ে খাদ্যে স্বয়ংনির্ভরতার জন্য কৃষকরা ভূগর্ভস্থ পানি বেশি পরিমাণে ব্যবহার করছে।

ভূগর্ভস্থ পানি পাম্প করে বের করে নেয়া হচ্ছে বেশি মাত্রায়- সেটা আবার ভর্তি হবার জন্য যে সময় প্রয়োজন তার তুলনায় বেশি পানি তুলে নেয়া হচ্ছে। ফলে মাটি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে বেশি। এর কারণে অনেক এলাকায় জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।

ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের রিপোর্টে বলা হচ্ছে এর ফলে বহু এলাকায় সেচের পানিতে "লবণাক্ততার উচ্চ ঝুঁকি" তৈরি হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নেমে যাওয়ায় পানির জন্য মাটির আরও গভীরে খনন চালানোয় শহরগুলো বসে যাওয়ার আশংকাও তৈরি হয়েছে।

হ্রদ নিশ্চিহ্ণ আর বিপদজনক ধূলি ঝড়

এছাড়াও ইরানে আরেকটা বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশটির জলাভূমি এবং নদীনালা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে। এর ফলে দেশটিতে বিপদজনক ধূলি ঝড় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উরমিয়া হ্রদ একসময় ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নোনাপানির হ্রদ। এটি এখন বিশাল পরিবেশগত ঝুঁকির একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। এক সময় এই হ্রদের আয়তন ছিল ১,৯৩০ বর্গমাইল। ২০১৫ সাল নাগাদ এই হ্রদের এক দশমাংশ পানি শুকিয়ে গেছে।

এলাকায় কৃষিকাজের যে ব্যাপক ও দ্রুত বিস্তার ঘটেছে তা সামাল দিতে এবং ১৯৯০এর দশকের খরার কারণে কৃষকরা তাদের চাষের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপক পরিমাণে তুলে নিয়েছে। এছাড়াও এলাকায় তৈরি হয়েছে অসংখ্য বাঁধ।

এই হ্রদ রক্ষার জন্য জনগণের বিক্ষোভের কারণে প্রেসিডেন্ট এই হ্রদটি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেচের কাজেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, ফলে এদিকে কিছুটা অগ্রগতি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

তবে হ্রদের আপাতদৃষ্টিতে সামান্য উন্নতি সংস্কারের কারণে নাকি ২০১৯-এর আকস্মিক বন্যার কারণে - তা এখনও স্পষ্ট নয়। আবার প্রলম্বিত খরা দেখা দিলে এই হ্রদের ভবিষ্যত আবার যে ঝুঁকির মুখে পড়বে না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

সান নিউজ/এমএম

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

শুটিংয়ে অপ্রীতিকর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ রাধিকা আপ্তে

চলচ্চিত্রে অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ও শুটিং সেটে অস্বস্তিকর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রক...

জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান

জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দি...

নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে শুরু হয়েছে এবং এর নানা লক্ষণও এখন দৃশ্য...

যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সকালে নিউইয়র্কের উ...

ভারী বৃষ্টিতে ডুবেছে নিউমার্কেট, ব্যাহত যান চলাচল

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারী বৃষ্টিতে নিউমার্কেট ও আশপাশে...

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় ২৬ লাখ ইউরো দিলেন মেসি

ফুটবল মাঠের বাইরেও বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন লিওনেল মেসি। এ...

বাংলাদেশ–ইউনান বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি ইউয়ান

চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অর্থনৈতিক...

এমপি নজরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরু...

১০ হাজার ব্যাংকারের পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ

ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহালে...

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-চীন

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা