লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের সবুজ পাহাড়ে ঘেরা মানসুরি গ্রামটি আজ যেন এক জীবন্ত ট্র্যাজেডির নাম। যুদ্ধ থেমে যাওয়ার কথা থাকলেও, যুদ্ধবিরতির এই সময়ে এসেও গ্রামটিকে মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে ফেলার এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা লাগাতার বোমা হামলা, ডিনামাইট দিয়ে বিস্ফোরণ আর বুলডোজারের তাণ্ডবে পাঁচ হাজার মানুষের এই জনপদটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
গ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী সেটিকে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে দাবি করলেও, এর চরম মূল্য চুকাতে হচ্ছে সাধারণ বাসিন্দাদের। কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতির তথাকথিত 'হলুদ রেখা' মানসুরি গ্রামটিকে মাঝখান দিয়ে দুই ভাগ করে দিলেও, বাস্তবে পুরো গ্রামটিই এখন ইসরায়েলি সেনার কবজায়। এই গরমের দিনেও সর্বস্ব হারিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোকে জীবনের টানে আবারও পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
গ্রামের ঠিক পাশের আরেকটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম হানিয়ে থেকে প্রতিদিন অপলক তাকিয়ে থাকতে হয় নিজেদের ভিটেমাটির ওপর চলা এই ধ্বংসযজ্ঞের দিকে। রাস্তার ধারে কিংবা গাছের আড়ালে চেয়ার পেতে বসেন মানসুরির অসহায় মানুষগুলো। কারো একটা হলুদ রঙের বাড়ি হয়তো তখনো একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, আবার মুহূর্তের মধ্যেই ইসরায়েলি ড্রোনের বা কেবলের সাহায্যে পাতা বোমায় চোখের পলকে তা ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
দূরবীন দিয়ে নিজেদের ঘরের অবশিষ্টাংশ দিয়ে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার দৃশ্য দেখতে দেখতে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেন মানসুরির সাবেক বাসিন্দারা। অনেকেরই চাষের জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে কর্মসংস্থান। প্রতিদিন ড্রোন হামলা আর বুলডোজারের শব্দে তিলে তিলে তাদের জীবনের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই দুর্দিনে মানসুরির মানুষগুলো সম্পূর্ণ একা। লেবানন সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—কারো পক্ষ থেকেই কোনো সাহায্য মেলেনি। এমনকি লেবাননের সেনাবাহিনীও সেখানে অনুপস্থিত। নিজেদের মতো করে একটু প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেলেও আন্তর্জাতিক কোনো চাপ না থাকায় কেউ আর ভরসা খুঁজে পাচ্ছে না।
তবুও সব হারিয়েও এই মানুষেরগুলোর মনে বেঁচে আছে মরচে না পড়া এক জেদ। তাদের পরিষ্কার কথা—'এই মাটি আমাদের রক্তে ভেজা, এটিই আমাদের সবকিছু। সব ধ্বংস হয়ে গেলেও আমরা একদিন ঠিকই ফিরে আসব এবং এই মাটিতেই আবার নতুন করে ঘর বাঁধব ইনশাআল্লাহ।'
সান নিউজ/রাজীব