আবুধাবি টেস্টে বল হাতে এক অবিশ্বাস্য ও সোনালী অধ্যায় রচনা করলেন হাসান মাহমুদ। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর রোমাঞ্চে ভরপুর তৃতীয় দিনের সকালে পেসারদের নৈপুণ্যে ম্যাচের মোড় পুরোপুরি নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। দিনের শুরুতেই নতুন বলের ফায়দা তুলে আফগান শিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করেন বোলাররা। তবে সব আলো কেড়ে নিজের নামের পাশে নতুন সব কীর্তি যোগ করেছেন তরুণ পেসার হাসান মাহমুদ। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে হ্যাটট্রিকের বিরল রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি ইনিংসে পাঁচ উইকেট বা ফাইফারের গৌরব অর্জন করেছেন তিনি।
তৃতীয় দিনের খেলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই কাঙ্ক্ষিত সেই দ্বিতীয় নতুন বল হাতে পায় বাংলাদেশ। আর প্রথম ওভার থেকেই সেই আস্থার প্রতিদান দিতে শুরু করেন পেসাররা। দিনের শুরুতেই ইবাদতের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করা ইকরাম। এই উইকেটের মাধ্যমে টাইগারশিবিরে যে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল, তার চেয়েও বড় চমক অপেক্ষা করছিল একটু পরে।
ম্যাচের ৮২তম ওভারের ঠিক শেষ ভাগে এবং পরের ওভারের শুরুতেই বোলিং আক্রমণে আগুন ঝরান হাসান মাহমুদ। একের পর এক বল নিখুঁত লেংথে ফেলে আফগান ব্যাটারদের তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দেন তিনি। ইনিংসের ৮২.৩ ওভারে তাঁর একটি নিচু হয়ে ভেতরে ঢোকা ব্যাক অব আ লেংথ ডেলিভারি পুরোপুরি মিস করে সরাসরি বোল্ড হয়ে যান ইসমত আলম।
ঠিক পরের বলেই অর্থাৎ ৮২.৪ ওভারে হাসানের করা বল আফগান ব্যাটারের ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপের দিকে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে ডান দিকে বিদ্যুৎগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক অবিশ্বাস্য ক্যাচ লুফে নেন লিটন দাস।
এরপর হ্যাটট্রিকের রোমাঞ্চকর মুহূর্তে ওভারের পঞ্চম বলটি (৮২.৫ ওভার) জিয়া-উর–রেহমানের প্যাডে আঘাত হানলে জোরালো আবেদন করেন ফিল্ডাররা। প্রথমে আম্পায়ার আউট না দিলেও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ দল সঙ্গে সঙ্গে রিভিউ নেয়। ব্রডকাস্ট স্ক্রিনের রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা যায়, বলটি সোজা গিয়ে অফ স্টাম্পের ওপরের অংশে আঘাত হানত। আর তাতেই টেস্ট ইতিহাসের ৫০তম এবং চলতি বছরে টেস্টের প্রথম হ্যাটট্রিকটি নিজের নামের পাশে লিখে ইতিহাস গড়েন হাসান মাহমুদ।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় বোলার হিসেবে হ্যাটট্রিকের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালেন এই পেসার। এর আগে ২০০৩ সালে অলক কাপালি এবং ২০১৩ সালে সোহাগ গাজী এই কীর্তি গড়লেও পেসারদের মধ্যে কেউ এই মাইলফলক ছুঁতে পারেননি। সুতরাং পেস বোলিংয়ের ইতিহাসে এটি বাংলাদেশের প্রথম কোনো টেস্ট হ্যাটট্রিক।
শুধু হ্যাটট্রিকেই থেমে থাকেননি হাসান। আফগানিস্তানের ইনিংসের শেষ দিকে ইয়ামিন আহমদজাইকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে ইনিংসে নিজের পঞ্চম উইকেট তুলে নেন তিনি। গত আগস্টে ডারউইন টেস্টে ৯ উইকেট শিকার করার আত্মবিশ্বাস আবু ধাবির এই উইকেটেও কাজে লাগিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের চতুর্থ ফাইফার পূর্ণ করলেন এই গতি তারকা।
একই সঙ্গে এই ম্যাচের উইকেটের মধ্য দিয়ে টেস্টে নিজের উইকেটের ফিফটি বা ৫০ উইকেটের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে এর আগে দ্রুততম ৫০ উইকেটের রেকর্ড ছিল মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তাসকিন আহমেদের দখলে, যাদের টপকে বেশ দ্রুতই এই ক্লাবে নাম লেখালেন হাসান।
সব মিলিয়ে, হাসান মাহমুদের এই জাদুকরী হ্যাটট্রিক ও পাঁচ উইকেটের অনবদ্য পারফরম্যান্সে আফগানিস্তানের প্রথম ইনিংসকে দ্রুত গুটিয়ে দেওয়ার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। আবু ধাবির খরা উইকেটেও পেসাররা যেভাবে নিজেদের জাত চিনিয়েছেন, তাতে ম্যাচের বাকি অংশটুকু এখন টাইগারদের অনুকূলে জমজমাট এক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সান নিউজ / রাজীব