একসময় লিওনেল মেসি ও ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে একই মাঠে খেলেছেন। আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজকেও। রিভার প্লেটের প্রতিশ্রুতিশীল এক প্রজন্মের অংশও ছিলেন গঞ্জালো ওলিদ আপাজা। কিন্তু ফুটবলের সেই স্বপ্নের পথ বেশিদূর এগোয়নি। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে এখন আলু, পেঁয়াজ ও নানা ধরনের সবজি সরবরাহের ব্যবসা করছেন তিনি।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আপাজার এই ভিন্নধর্মী জীবনের গল্প। মাত্র ১২ বছর বয়সে রিভার প্লেটের যুব একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন আপাজা। সান মিগুয়েল থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে চালিয়ে যেতেন অনুশীলন। ১৯৯২ ব্যাচে তার সতীর্থ ছিলেন এরিক লামেলা, এজেকিয়েল সিরিলিয়ানো, লিয়ান্দ্রো গঞ্জালেস পিরেজ ও রদ্রিগো রে। সেই দল যুব পর্যায়ে পাঁচটি শিরোপাও জিতেছিল।
তবে প্রতিভার ঝলক দেখালেও রিভার প্লেটের মূল দলে জায়গা করে নিতে পারেননি আপাজা। একপর্যায়ে তাকে নিচের স্তরের ক্লাবগুলোতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে হয়। জাতীয় দলের বয়সভিত্তিক পর্যায়ে অবশ্য তার পথ খুলে গিয়েছিল। উবালদো ফিলোলের নজরে পড়ার পর আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলেন তিনি।
২০০৯ সালের দক্ষিণ আমেরিকান অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপে আপাজা ছিলেন মার্তিনেজের সতীর্থ। সেই সময়ের কথা মনে করে ইনফোবেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মার্তিনেজের মধ্যে তখনই সেই আত্মবিশ্বাস ছিল, যা এখনো দেখা যায়। আপাজার ভাষায়, মার্তিনেজের সাফল্য তাকে অবাক করেনি।
আর্জেন্টিনার যুব দলের হয়ে আপাজার সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি এসেছিল জাতীয় দলের অনুশীলনে। ২০০৯ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের আগে তরুণ খেলোয়াড়দের সিনিয়র দলের অনুশীলনে নেওয়া হতো। তখন জাতীয় দলের কোচ ছিলেন ম্যারাডোনা।
প্রতি বুধবার সিনিয়র দলের সঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ পেতেন তারা। ফলে মেসিসহ আর্জেন্টিনার একঝাঁক তারকার সঙ্গে একই মাঠে খেলেছেন আপাজা। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, অনুশীলনের সময় মেসিকে সামনে দেখে তাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিল। নিজের চোখে দেখা দৃশ্যটি বাস্তব কি না, সেটিই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না তার।
মেসির খেলার ধরনও তাকে মুগ্ধ করেছিল। রিভার প্লেটের মূল দলে জায়গা না পাওয়ার পর আপাজা খেলেছেন দেপোর্তিভো মেরলো, ডিফেনসোরেস দে বেলগ্রানো, কামবাসেরেস ও সান মিগুয়েলের মতো ক্লাবে। কিন্তু রিভার প্লেটের ঝকঝকে পরিবেশ থেকে নিম্নস্তরের ফুটবলের বাস্তবতা ছিল একেবারেই আলাদা। আপাজা জানিয়েছেন, কখনো কখনো তাদের পর্যাপ্ত পোশাক বা গরম পানির ব্যবস্থাও থাকত না।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে কামবাসেরেসের হয়ে একটি ম্যাচ খেলার পরই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেন তিনি। বাবাকে ফোন করে জানান, আর পেশাদার ফুটবল খেলতে চান না। কারণটাও ছিল সরল—ফুটবল থেকে আনন্দটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।অবসরের পর প্রথম কাজের সুযোগ আসে এক বন্ধুর মাধ্যমে। তিনি পানি সরবরাহের কাজ করতেন এবং আপাজাকে ভোর পাঁচটা থেকে কাজে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
ফুটবল খেলে জমানো অর্থ দিয়ে পরে একটি ট্রাক কেনেন আপাজা। এরপর যোগ দেন পারিবারিক ব্যবসায়। এখন তার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বাজার, বার ও রেস্তোরাঁয় আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি সরবরাহ করে।
মেসি-ম্যারাডোনার সঙ্গে একই মাঠে খেলা, মার্তিনেজের সতীর্থ হওয়া কিংবা রিভার প্লেটের হয়ে শিরোপা জেতার সেই দিনগুলো এখন তার জীবনের স্মৃতি। আর বর্তমানের পরিচয়—ফুটবলার নয়, নিজের ব্যবসা দাঁড় করানো একজন সবজি সরবরাহকারী।
সাননিউজ/বান্না