যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপের ছোট দেশ লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব নেওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে আমেরিকানদের। বিশেষ করে, যাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে লুক্সেমবার্গের পারিবারিক যোগসূত্র রয়েছে, তারা বংশপরিচয়ের সূত্র ধরে নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকের কাছে ইউরোপের নাগরিকত্ব এখন বিকল্প ভবিষ্যৎ গড়ার পথ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভার শহরের ৩৫ বছর বয়সী ক্যারিস ক্যাসিডি তাদেরই একজন। ছোটবেলা থেকেই তার ইউরোপে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তার উদ্বেগও বেড়েছে।
ক্যাসিডি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করে নিজের জীবন উন্নত করতে গেলেও অনেক সময় ঋণের বোঝা নিতে হয়, নয়তো বাসস্থান ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় কাটছাঁট করতে হয়। তার কাছে ইউরোপকে মনে হয়েছে একটু স্বস্তিতে নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা।
পরে তিনি জানতে পারেন, তার পাঁচ প্রজন্ম আগের এক পূর্বপুরুষের জন্ম লুক্সেমবার্গে। অনলাইনে পারিবারিক ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, উনিশ শতকে তার কয়েকজন পূর্বপুরুষ লুক্সেমবার্গ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। পরে তারা শিকাগো হয়ে মিনেসোটা, আইওয়া ও কানসাসে বসবাস করেন।
এই পারিবারিক সূত্র কাজে লাগিয়ে লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন ক্যাসিডি। দেশটির আইনে নির্দিষ্ট শর্তে পূর্বপুরুষের সূত্র ধরে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতেই প্রায় এক বছর লেগেছিল। তবে নাগরিকত্ব পেতে ভাষা পরীক্ষা দেওয়া কিংবা দেশটিতে সশরীরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
গত মার্চে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ক্যাসিডি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে সুইডেনে চলে যান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। বর্তমানে লিঙ্গান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া ক্যাসিডি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে আবার ইউরোপে কোথায় স্থায়ী হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব নেওয়ার আগ্রহ আরও বেড়েছে। দেশটির জাতীয় নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ৩ হাজার ৫৭৪ জন আমেরিকান লুক্সেমবার্গের নাগরিক হিসেবে নথিভুক্ত হন। দেশটিতে এ ধরনের হিসাব রাখা শুরুর পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সংখ্যা।
তবে লুক্সেমবার্গের বিচার মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ওই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৬৫৭ জন আমেরিকান নতুন করে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। দুই হিসাবের পার্থক্যের কারণ হলো, জাতীয় নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত অনেকেই আইনের শর্ত অনুযায়ী আগে থেকেই দেশটির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি পরে নথিভুক্ত হয়েছে।
বিচার মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ৬৫৭ জন স্বেচ্ছায় আবেদন করে স্বাভাবিকীকরণ, বিশেষ বিধান কিংবা পূর্বের নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কায় জন্ম নেওয়া ড্যানিয়েল অ্যাটজও পারিবারিক সূত্রে লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তার প্রপিতামহী মার্গারিট ক্রুখটেন লুক্সেমবার্গে জন্মেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি কানসাসে চলে যান।
লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অ্যাটজ ২০১৪ সালে নাগরিকত্ব পান। এর মাধ্যমে তিনি ইউরোপে নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়দের খুঁজে পান এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার ভাষায়, এই নাগরিকত্ব তার জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
২০০৮ সালে লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে পূর্বপুরুষের সূত্র ধরে নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পরে ২০১৭ সালেও এ বিষয়ে আরেকটি আইন করা হয়। ওই আইনের আওতায় আবেদন করার সময়সীমা ছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
বর্তমানে অ্যাটজ তার প্রতিষ্ঠিত নাগরিকত্ববিষয়ক পরামর্শমাধ্যমের মাধ্যমে অন্য আমেরিকানদেরও আবেদনপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন। তার ভাষ্য, ২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার সময়ও নাগরিকত্বের আবেদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে।
অ্যাটজ জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে তার প্রতিষ্ঠানের সেবা নেওয়ার আগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকে। গত বছর তাদের কর্মীর সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে ১৫ জনে দাঁড়ায়। তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯০০ আমেরিকানকে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেছে। তবে তার হিসাব অনুযায়ী, লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা আমেরিকানদের মোট সংখ্যার মাত্র ১৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে তার প্রতিষ্ঠান।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে তার সহায়তা নেওয়া অনেকের মধ্যে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তাদের নাগরিকত্ব নেওয়ার আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব নেওয়ার সংখ্যা বাড়লেও অধিকাংশ আমেরিকান দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে যাচ্ছেন না। অনেকের কাছে ইউরোপের নাগরিকত্ব অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা। আবার অনেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে বসবাস ও কাজের সুযোগ পাওয়ার আশায় নাগরিকত্ব নিচ্ছেন।
অ্যাটজের মতে, নাগরিকত্ব নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫ শতাংশেরও কম লুক্সেমবার্গে স্থায়ীভাবে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এর একটি কারণ দেশটির উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের তুলনায় সেখানে ভোক্তাপণ্যের দাম প্রায় ৫১ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি নতুনদের জন্য সব ধরনের চাকরির সুযোগও নেই।
অ্যাটজ জানান, তার অনেক গ্রাহক শেষ পর্যন্ত স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ক্যাসিডিও লুক্সেমবার্গে থিতু হতে চান, তবে আর্থিক দিক থেকে সেটি তার জন্য কতটা সম্ভব, তা নিয়ে নিশ্চিত নন।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিক ইউরোপীয় নাগরিকত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বিদেশে বসবাসরত কিছু আমেরিকান মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন। গত দুই বছরে নাগরিকত্ব ত্যাগের সংখ্যাও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ক্যাসিডি আপাতত মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে চান না। তার আশা, আগামী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তিনি বলেন, অনেক খারাপ ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার এবং শেষ পর্যন্ত ভালো কিছু হওয়ার আশা তিনি ছাড়েননি।
ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটে, তা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে বলেও মনে করেন ক্যাসিডি।
সান নিউজ/ রাব্বি