লোহিত সাগরের অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার কথা ভাবছে সৌদি আরব। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের কোণঠাসা করতে এই পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আঞ্চলিক ও পশ্চিমা বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সৌদি-সমর্থিত বাহিনী স্থলভাগে এই অভিযান পরিচালনা করতে পারে।
অভিযানের মূল লক্ষ্য ও সম্ভাব্য পরিকল্পনা : গত মাসেই লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির একাংশের দখল নেয় হুথি বিদ্রোহীরা। উপকূল ধরে এগিয়ে গিয়ে তারা কৌশলগতভাবে এই অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। রিয়াদের নীতিনির্ধারকদের মতে, হুথিরা এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে; ফলে তাদের হটিয়ে এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সামরিক পদক্ষেপের জন্য দুটি আলাদা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রথম পরিকল্পনাটি হলো বাব আল-মান্দেব ও এর আশপাশের এলাকায় একটি নির্দিষ্ট ও সীমিত পরিসরের অভিযান চালানো। আর দ্বিতীয় ও বৃহত্তর পরিকল্পনা অনুযায়ী— আল-বাইদা, মারিব, তাইজ এবং আল-জাওফসহ ইয়েমেনের বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে একযোগে বড় আক্রমণ পরিচালনা করা। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন সাপেক্ষে এই ব্যাপক অভিযানে প্রায় ১ লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনাকে মাঠে নামানো হতে পারে।
মিত্র দেশগুলোর ভূমিকা ও সামরিক সহায়তা : সৌদি আরবের এই পদক্ষেপে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো পশ্চিমা বা আঞ্চলিক দেশ সরাসরি অংশ না নিলেও, নেপথ্যে নানা ধরনের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এই অভিযানে রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য ও কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে সরাসরি মার্কিন যুদ্ধবিমান দিয়ে বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার সৌদি অনুরোধ নাকচ করে দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, গত মাসেই তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিয়াদের অনুরোধে তারা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জামসহ বেশ কিছু কার্গো বিমান এডেনে পাঠিয়েছে। এছাড়া সৌদি সীমান্ত রক্ষা ও নিরাপত্তা জোরদার করতে পাকিস্তান ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করলেও, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি লড়াইয়ে তারা অংশ নিচ্ছে না। এদিকে ফ্রান্সও সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরনগরী রক্ষার্থে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
ইয়েমেনি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও বিভাজন : এই সামরিক অভিযানের মূল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে স্থানীয় বিভিন্ন ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর। গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ বছরগুলোতে রিয়াদ ও আবুধাবি এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিলেও তাদের ভেতর এখনো যথেষ্ট অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের মতো সুসংগঠিত ও লড়াকু একটি বাহিনীকে পরাস্ত করতে যে ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত অভিযানের প্রয়োজন, তার জন্য স্থানীয় হুথিবিরোধী বাহিনীগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে, গত শীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষ এই বিভেদকে আরও স্পষ্ট করেছিল।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানের চূড়ান্ত সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করবে স্থলভাগে লড়াকু ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর কার্যকারিতা এবং তাদের যৌথ সক্ষমতার ওপর।
সান নিউজ/রাজীব