মরক্কোর রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফাতিমা এজ্জাহরা এল মানসৌরিকে নিয়োগ দিয়েছেন। আরব বিশ্বের ইতিহাসে সরকারপ্রধান হওয়া নারীদের তালিকায় তিনি হলেন দ্বিতীয়। এর আগে তিউনিসিয়ার নাজলা বৌদেন ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
রাজপ্রাসাদের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে ৫০ বছর বয়সী মানসৌরিকে নতুন সরকার গঠনের এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে টেলিভিশন ভাষণে তিনি একে ‘সত্যিই ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো নারী হিসেবে এই দায়িত্ব পাওয়া কেবল আমার একার নয়, বরং মরক্কোর প্রতিটি নারীর জন্য ভীষণ গর্বের বিষয়।
গত সপ্তাহের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের মাত্র চার দিন পরই এই বড় ঘোষণা এল। এবারের নির্বাচনে রাজাঘনিষ্ঠ দল ‘অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি’ বা পিএএম সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৯৭টি আসন নিশ্চিত করে। তবে ৩৯৫ আসনের এই সংসদে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন থেকে দলটি কিছুটা দূরে রয়েছে। ফলে ক্ষমতা নিশ্চিত করতে এখন জোট গঠনই মানসৌরির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৮ সালে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফুয়াদ আলি এল হিম্মা পিএএম দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
জোট গঠনের এই প্রক্রিয়ায় পিএএম সব দলের সঙ্গেই কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তবে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি)-সহ কয়েকটি দল ইতিমধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা বিরোধী দলের আসনেই থাকতে চায়। নতুন এই সরকারের কাঁধেই বর্তাবে ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আসা বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের সঠিক তদারকি ও অর্থ বরাদ্দের কাজটি। উল্লেখ্য, ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের মূল আয়োজক হিসেবে মরক্কোর সঙ্গে রয়েছে পর্তুগাল ও স্পেন।
১৯৭৬ সালে মারাকেশে জন্ম নেওয়া ফাতিমা এজ্জাহরা এল মানসৌরি শিক্ষাজীবনে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ফ্রান্সের বিখ্যাত মঁপেলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডভান্সড স্টাডিজে ডিপ্লোমা অর্জনের পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও অ্যাংলো-স্যাক্সন ব্যবসায়িক আইনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি হয়েছিল ২০০৯ সালে মারাকেশের প্রথম নারী মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়ার মাধ্যমে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের নির্বাচনে পুনরায় মেয়রের চেয়ারে ফেরার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবেও নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।
সর্বশেষ ২০২১ সালের অক্টোবর থেকেই তিনি জাতীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছিলেন। আবাসন, নগর পরিকল্পনা এবং ভূখণ্ড উন্নয়নের পাশাপাশি আল হাউজ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং সরাসরি আবাসন সহায়তা কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর কাজগুলো তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জোট সরকার গঠন এবং দেশের উন্নয়নযাত্রাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়াটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সান নিউজ/রাজীব