সিয়াং নদী অরুণাচল থেকে আসাম হয়ে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত। ছবি : সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে অরুণাচলে আদিবাসীদের ক্ষোভ বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকা এখন তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হিমালয়ের কোলঘেঁষা এই অঞ্চলে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল এক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার।

'সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প' নামে পরিচিত এই মেগা উদ্যোগের প্রাথমিক সমীক্ষা ও খননকাজের জন্য উগেং-কমকার এলাকায় ব্যাপক সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় শক্তির এমন কঠোর উপস্থিতি সত্ত্বেও স্থানীয় আদিবাসীদের মনে স্বস্তির লেশমাত্র নেই। উল্টো, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে ফুঁসছেন তারা।

আন্দোলনের আঁচ ও রাজপথের লড়াই
প্রকল্পের প্রাক্-সমীক্ষার প্রতিবাদে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সম্প্রতি চারজন আন্দোলনকারীকে অরুণাচলের বিতর্কিত 'বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন' বা ইউএপিএর আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়। এই আটকের ঘটনা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। ফলস্বরূপ, আপার সিয়াং জেলার গেকু অঞ্চলের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। সিয়াং আদিবাসী কৃষক ফোরামের (এসআইএফএফ) যুব শাখা সরকারের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতামূলক বৈঠক বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।

পরিস্থিতি কতটা জটিল, তার প্রমাণ মেলে গত সেপ্টেম্বর মাসে। ওই সময় মুখ্যমন্ত্রী পেমা খানডু এলাকাটি সফরে গেলে সেখানে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ জনতা এক স্থানীয় বিধায়কের বাসভবনে চড়াও হন এবং পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নতুন করে সংঘর্ষ বাধে।

একপক্ষে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে, অন্যপক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নেমেছেন খোদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা অরুণাচলেরই সন্তান কিরণ রিজেজু। গত ৮ অক্টোবর তিনি আদি সম্প্রদায়ের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে জরুরি আলোচনার বসার আহ্বান জানান। কিরণ রিজেজু’র মতে, খোলামেলা সংলাপের মাধ্যমেই কেবল এই জটিল জট ছাড়ানো সম্ভব।

রাজনৈতিক অবস্থান বদলের দীর্ঘ ইতিহাস
সিয়াং নদীকে কেন্দ্র করে ভারতের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান অতীতে বহুবার বদলেছে। প্রায় দেড় দশক আগের দৃশ্যপট দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ২০১০ সালের দিকে যখন কংগ্রেসের শাসনকাল চলছে, তখন সিয়াং পিপলস ফোরামের তৎকালীন প্রধান ওজিং তাসিংয়ের ইটাগরের বাড়িতে সাঁড়াশি তল্লাশি চালায় প্রশাসন। এরপর তাসিং দিল্লিতে গিয়ে তৎকালীন ইউপিএ সরকারের পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন।

সে সময় ওই মন্ত্রী খোদ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে চিঠি লিখে স্বীকার করেছিলেন যে, বাঁধগুলোর কৌশলগত যৌক্তিকতা নিয়ে স্থানীয়দের সন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না। এমনকি পরিবেশবাদীরা একে ভারত-চীন কৌশলগত খেলায় অরুণাচলকে 'দাবার ঘুঁটি' বানানোর চক্রান্ত হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন।

সে সময় বিজেপির কিছু নেতা এবং তাদের আদর্শিক সংগঠন আরএসএস সমর্থিত মহলও এই বাঁধগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ২০১২ সালে রাজ্যসভায় তৎকালীন বিজেপি সংসদ সদস্য তরুণ বিজয় প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন সাধারণ মানুষের প্রতিবাদকে চীনের উসকানি বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় নরেন্দ্র মোদিও বড় বড় বাঁধের পরিবেশগত ঝুঁকির কথা স্বীকার করে ছোট আকারের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

তবে সময়ের পরিক্রমায় ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে নেতাদের সুরও। বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয়ত্রই ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই মেগা প্রকল্পের কট্টর সমর্থক। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খানডু তো বলেই দিয়েছেন, প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকেও ছাড় দেওয়া হবে না।

সবচেয়ে নাটকীয় বদলটি এসেছে এককালের বাঁধবিরোধী আন্দোলনের অগ্রপথিক ওজিং তাসিংয়ের ক্ষেত্রে। অতীতে যিনি সিয়াংয়ের নদী বাঁচাতে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, আজ তিনি পেমা খানডু মন্ত্রিসভার অন্যতম প্রভাবশালী মন্ত্রী (গ্রামীণ উন্নয়ন ও পঞ্চায়েতিরাজ)। তার বর্তমান যুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন—চীন যদি তাদের অংশে বাঁধ নির্মাণ করে সিয়াংকে 'পানিবোমা' হিসেবে ব্যবহার করে, তবে ভারতেরও নিজেদের সুরক্ষায় ভাটিতে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

বেইজিং ফ্যাক্টর এবং কৌশলগত বাধ্যবাধকতা
এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে দিল্লি সরকারের মূল যুক্তিটি ভূরাজনৈতিক। তিব্বতের হিমালয় থেকে নেমে আসা ইয়ারলুং সাংপো নদীটি অরুণাচলে প্রবেশ করে সিয়াং নাম ধারণ করেছে এবং পরবর্তীতে আসাম হয়ে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চীন এই নদীর ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়িয়ে চলেছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীনা কর্তৃপক্ষ ইয়ারলুং সাংপোর ভাটি অঞ্চলে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল এক জলবিদ্যুতের অনুমোদন দেয়। সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে নদীর খাড়া ঢালকে কাজে লাগাতে চায় বেইজিং।

ভারতীয় কৌশলবিদদের আশঙ্কা, সংকটজনক মুহূর্তে চীন যদি আকস্মিক বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেয়, তবে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। এই সম্ভাব্য পানিসন্ত্রাস মোকাবিলা এবং নিজস্ব পানিসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যই সিয়াংয়ে বিশাল জলাধার নির্মাণের যুক্তি সাজিয়েছে নয়াদিল্লি।

২০১৭ সালে নীতি আয়োগের হাত ধরে এই সমন্বিত ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত ও ঐতিহ্যবাহী কেবাংয়ের হুংকার
তবে সরকারের এই স্ট্র্যাটেজিক যুক্তির সঙ্গে সবাই একমত নন। নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠাক্করের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে তথাকথিত 'প্রথম ব্যবহারকারীর অধিকার' বা এককভাবে পানিসম্পদ দখলের কোনো জোরালো ভিত্তি নেই। তার পরামর্শ, এককভাবে নিজেদের নাগরিকদের ওপর মেগা প্রকল্প চাপিয়ে না দিয়ে, ভারতের উচিত চীনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিবেশগত ও ভূপ্রাকৃতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা।

স্থানীয় আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ 'কেবাং'-এর সিদ্ধান্ত এই আন্দোলনের গভীরতা প্রকাশ করে। দীর্ঘ ২৫ বছর পর গত বছরের আগস্টে আদিদের সর্বোচ্চ পরিষদ 'বোগুম বোকাং কেবাং'-এর বিরল এক মহাসভা বসে। এই বৈঠকে প্রায় ২৭টি গ্রাম সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ার এবং এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

আদি জনগোষ্ঠীর কাছে এই নদী কেবল জলপ্রবাহ নয়; সিয়াং তাদের কাছে মা এবং এই মাটি তাদের পৌরাণিক আদিপুরুষ আবো তানির পবিত্র উপহার। তাই আশঙ্কাটি শুধু জমি বা বাসস্থানের নয়, বরং তাদের আবহমানকালের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, জীবনাচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বিলীন হয়ে যাওয়ার।

জাতীয় সুরক্ষার বিশাল চাকার নিচে সাধারণ মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির বলিদান কি অনিবার্য? উন্নয়নের এই মারপ্যাচে নদীপারের মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

এই জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থানীয় আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সমীকরণ মেলানোর ক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পথটি কী হতে পারে বলে মনে করেন?

সান নিউজ / রাজীব

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

তেল সংকটে বাড়ছে বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি, সতর্ক করল আইএমএফ

জরুরি তেলের মজুত কমে আসা, সরকারি ঋণের বোঝা বৃদ্ধি...

রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ ৮ জনকে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড

রাজধানীর পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে দুর...

সাক্ষাৎকারে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানালেন অভিনেত্রী

দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী নীতি টেলর সম্প্রতি নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্...

পাকিস্তানে ৩৮.৩ শতাংশ মানুষই দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট, বাংলাদেশে ১৪.৯ শতাংশ

বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং বঞ্চনার সার্বিক চিত্র নিয়ে সম্প্রতি এক...

প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় নতুন করে চাপে দেশের অর্থনীতি

বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান যৌথ বার্ষিক সভা উপল...

অটোরিকশার গ্যারেজে ইয়াবা ও আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেপ্তার ৩

নোয়াখালীর সদর উপজেলায় অটোরিকশার গ্যারেজে অভিযান চা...

নোয়াখালীতে হাসপাতালে গ্রিল কেটে ৯ লাখ টাকা চুরি

নোয়াখালীর সদর উপজেলায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের পরি...

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে অরুণাচলে আদিবাসীদের ক্ষোভ বাড়ছে

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকা এখন তীব্র রাজন...

মাদারীপুরে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত

‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি&r...

৩৭টি পূজামণ্ডপে আর্থিক অনুদান মুন্সীগঞ্জ বিএনপি নেতার

শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজে...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা