সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার আগে সাধারণ মানুষকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। অথচ এর কয়েক দিন আগেও দেশটির সতর্কতা ব্যবস্থা থেকে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে বার্তা পাঠানো হচ্ছিল। গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে চার দফা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর দেশটির আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার আগে সতর্কবার্তা না দেওয়ার বিষয়ে সৌদি সরকার এখনো প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে কয়েকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকের ধারণা, দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি বজায় রাখা এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চেষ্টা এ সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দেওয়া, উদ্ধারকাজ পরিচালনা ও অগ্নিনির্বাপণের দায়িত্ব পালন করে সংস্থাটি। গত মে মাসে মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করে সৌদি আরব।
তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা বাড়লেও গত সপ্তাহের প্রাণঘাতী হামলার আগে এই ব্যবস্থা থেকে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। সংস্থাটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগে সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল গত ২৯ সেপ্টেম্বর। সেটি ছিল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের বাসিন্দাদের জন্য।
এরপর গত সোমবার, ১২ অক্টোবর, আবারও সতর্কবার্তা জারি করা হয়। এতে রিয়াদসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরের বাসিন্দাদের সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। তবে বিমানবন্দরে হামলার পরই সতর্কবার্তা ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
রয়টার্স জানিয়েছে, সতর্কবার্তা বন্ধ রাখার কারণ জানতে সৌদি আরবের কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন দেশটির মিত্র একটি পশ্চিমা সরকারের কর্মকর্তারা। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি অবগত এমন দুজন কর্মকর্তা জানান, তাঁদের বলা হয়েছিল, সতর্কবার্তার কারণে জনজীবনে বিঘ্ন ঘটছিল। রাতে সতর্কবার্তা পেয়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগও করেছিলেন।
তবে এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি সৌদি সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত সৌদি গবেষক সুলতান আলামের মতে, সৌদি সরকার একদিকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে চাইছে, অন্যদিকে দেশের নাগরিক ও বিদেশি অংশীজনদের আস্থাও ধরে রাখতে চাইছে। তাঁর মতে, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা থেকেই সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনিও বলেছেন, হামলার বিষয়ে জনগণকে কীভাবে জানানো হবে, তা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ দ্বিধায় রয়েছে। হুতি বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে গিয়ে জনজীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি হোক, তা তারা চায় না। তবে আগাম সতর্কবার্তা না থাকায় মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় ভিন্নতা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের হামলার মুখে পড়েছে। তবে এসব হামলার বিষয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করার পদ্ধতি দেশভেদে আলাদা।
কাতার প্রায় প্রতিটি হামলার আগে মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। পাশাপাশি মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকতে এবং জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বাহরাইন ও কুয়েত বারবার সাইরেন বাজিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সৌদি আরবে অবশ্য চলতি মাসের ১২ অক্টোবরের আগপর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সামরিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের মধ্যে রিয়াদ প্রায় এক ডজনবার হামলার শিকার হয়েছিল।
সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও দেশটির সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা কঠিন। বিশাল আয়তনের সৌদি আরবে বিমানবন্দর, জ্বালানি তেলের পাইপলাইন এবং তেল স্থাপনাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, একই সময়ে এসব স্থাপনা সুরক্ষিত রাখার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সৌদি আরবের হাতে নেই। ফলে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ অনেক বেশি।
দূতাবাসগুলোও কি সতর্কবার্তা পায়নি?
সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা বন্ধ থাকলেও সৌদি আরবে কর্মরত পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মীদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের হামলার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল। এসব বার্তা তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা তথ্য এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করা হতো।
রয়টার্সের দেখা সতর্কবার্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে প্রথম দিকের দুটি হামলার সময় দূতাবাসের কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু শনিবার, ১০ অক্টোবরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার আগে দূতাবাসগুলোও কোনো অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তা পায়নি। সেদিন কেন সতর্কতা দেওয়া হয়নি, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
হামলার মধ্যেও চলেছে আন্তর্জাতিক সম্মেলন
বিমানবন্দরে হামলার পরও গত সোমবার রিয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলনের আয়োজন করে সৌদি আরব। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বড় কয়েকটি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্মেলনের কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন।
সম্মেলনে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। রিয়াদে আসা অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁরা জানেন সৌদি আরব নিরাপদ। তবে তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেন, সম্মেলন আয়োজনের অর্থ এই নয় যে সব ঝুঁকি কেটে গেছে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামরিক হামলা মোকাবিলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও বিদেশি অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রাণঘাতী হামলার আগে আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ার কারণ এখনো স্পষ্ট না হওয়ায় দেশটির সতর্কতা ব্যবস্থা ও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সান নিউজ/ রাব্বি