সারাদেশ

বদলে গেছে বেদের জীবন, যাচ্ছে স্কুলে সন্তানরাও

শফিক স্বপন , মাদারীপুর

'আমরা এক ঘাটেতে রান্দি-বাড়ি, আরেক ঘাটেতে খাই। আমাদের সুখের সীমা নাই!' বেদেদের এই প্রচলিত সঙ্গীতের মতোই ছিল তাদের জীবন-যাপন। তবে সময়ের পরিক্রমায় পাল্টে যাচ্ছে বেদে জীবন যাপনের পুরাতন ধারা। জলে ভাসা জীবনের ইতি টানছেন অনেকেই। হচ্ছেন ডাঙ্গার স্থায়ী বাসিন্দা। শিশুদের পাঠাচ্ছেন স্কুল/মাদ্রাসায়। সাপ ধরা, সাপ খেলার পরিবর্তে বেদে যুবকদের বেশির ভাগই এখন অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। কেউ ব্যাটারি চালিত ভ্যান চালাচ্ছেন, কেউ আইসক্রিম বিক্রি করছেন আবার রাজমিস্ত্রির কাজও করছেন অনেকে। এভাবেই পরিবর্তন হচ্ছে তাদের পেশা, বসবাসের ধরণ।

মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর সংলগ্ন পাঁচ্চর-কাওড়াকান্দি পুরাতন সড়কে(পরিত্যক্ত) গত ২০ বছর ধরে স্থায়ীভাবে ঘর তুলে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের কমপক্ষে অর্ধশত পরিবার। এসকল পরিবারে সদস্য সংখ্যা প্রায় আড়াই শতাধিক। ছোট খুপরি ঘরে বসতি শুরু করলেও আর্থিক উন্নতি হওয়ায় এখানকার অনেকেই ঘর তুলছেন বড় পরিসরে। পরিবারের ছোট শিশুদের পাঠাচ্ছেন কাছের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অথবা মাদ্রাসায়। তবে প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে খুব বেশি লেখাপড়া হয় না। এর আগেই কাজে নেমে পড়েন বেদে পরিবারের শিশুরা। যারা বর্তমানে কিছুটা স্বচ্ছল, তাদের পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া করানোর স্বপ্নও দেখছেন তারা।

সরেজমিনে বেদেপল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পুরুষেরা। অন্যদিকে খোশ-গল্পে অলস সময় কাটাচ্ছেন নারীরা। পাঁচ্চর সংলগ্ন মাদবরেরচর ইউনিয়নের কাওড়াকান্দি-পাঁচ্চর পরিত্যক্ত সড়কের দুইপাশে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। এর পরেই দুইপাশে ছোট ছোট খুপড়ি ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। ছোট খুপরি ঘরের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি ঘরও তৈরি করেছেন অনেকে। সরকারি পরিত্যক্ত এই জায়গায় প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন তারা।

আলাপ চারিতায় তারা জানান, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর এলাকার এই বেদে সম্প্রদায় এক সময় নৌকায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। বসবাস করতেন নদীর পাড়ে। তবে শিবচরে আসার পর পরিত্যাক্ত সড়কের পাশে থাকতে গিয়ে আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পেয়েছেন তারা। দীর্ঘদিন এক স্থানে থাকার ফলে পৈত্রিক পেশারও পরিবর্তন ঘটছে। স্থানীয় নানান পেশায় নিয়োজিত হয়ে আর্থিক ভাবে স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছেন এই সম্প্রদায়। ফলে পুরাতন পেশা বদলে ফেলেছেন অনেকেই। তাবু বা খুপড়ি ঘরের পরিবর্তে বড় ঘরে আধুনিক জীবন-যাপন শুরু করেছেন বেদে সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার।

মো.হাসিবুল নামের বেদে সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বলেন,'শিবচরে প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস। সরকারি রাস্তার পাশে প্রথমে তাবু করে থাকতাম। প্রথম দিকে আমাদের পৈত্রিক পেশাতেই ছিলাম। তবে এখন আর লোকজন তেমন বিশ্বাস করে না। আয়-রোজগারও তেমন নেই। এরপর থেকেই পেশা পরিবর্তন শুরু হয়। অনেকেই ভ্যান চালায়। আইসক্রিম বিক্রি করে। রাজমিস্ত্রির কাজও করে অনেকেই। এভাবে উপার্জন বাড়ায় পূর্বে পেশা এখন নেই বললেই চলে।'

আরেক ব্যক্তি দয়াল সরদার বলেন,'এখন নদী পথ শুকিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। নৌকায় করে সব জায়গায় যাওয়া যায় না। নৌকা নিয়েই শিবচরের এই এলাকায় আসি। এরপর আর নৌকায় ফিরে যাওয়া হয়নি। এখানে জীবনযাত্রা বেশ আধুনিক। আমরা ঘর তুলে স্থায়ীভাবে প্রায় ২০ বছর ধরে আছি এখানে। ভোটারও হয়েছে অনেকে। আবার স্থানীয় মেয়ে বিয়ে করে অনেকটাই স্থায়ী হয়ে গেছে। আমাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলেও পাঠাচ্ছি। আগে লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। এখন এই এলাকার সমাজের সাথে মিশে আমাদের শিশুরাও স্কুলমুখী হয়েছে।'

বেদে নারী কুলসুম বলেন,'আগে গ্রামে ঘুরে ঘুরে সিঙ্গা লাগানো, বাতের ব্যাথার ওষুধ বিক্রি করতাম। এখন এসব চলে না। আমাদের সম্প্রদায়ের পুরুষেরা এখন কাজকর্ম করে থাকে। নারীদের মধ্যেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। নারীরা গ্রামে বের হলেও এই সংখ্যা কমে আসতেছে।'

স্থানীয়রা জানান,'এখানে ৪০/৫০ ঘর বেদের বসবাস। দীর্ঘদিন ধরেই তারা এখানে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে এখনও সরদার প্রথা রয়েছে। তবে আধুনিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তারা। পৈত্রিক পেশার পরিবর্তে সাধারণ কাজকর্ম করছে। সব মিলিয়ে গ্রামের অন্য সাধারণ মানুষের মতোই এখানকার জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা।'

মাদবরেরচর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুলতানা ফেরদৌসী বলেন,'আমাদের এখানে বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। আগে তারা ভাসমান ছিল। এখন পরিত্যক্ত সড়কের পাশে ঘর তুলে বসবাস করছে। তারা এখানে এক প্রকার স্থায়ী হয়ে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও তাদের সাহায্য সহযোগিতা করা হয়।'

সকাল হলেই পরিবারের পুরুষেরা বেড়িয়ে পড়েন কাজে। বেদে শিশুরা যায় স্থানীয় মাদরাসায়। কেউ কেউ প্রাইমেরি স্কুলে। পৈত্রিকা পেশা বদলে ফেলতে প্রানান্ত চেষ্টা বেদে যুবকদের মধ্যে। আর তাই স্থানীয় নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন তারা। পরিশ্রম করছেন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে। এভাবেই সমাজের মূল ধারার জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা এই সম্প্রদায়ের মানুষের।

সাননিউজ/বান্না

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

রিয়াদে হুতি হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশি

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় জমে থাকা কালো মেঘ এবার সরাসরি আঘাত হানল প্রবাসীদের রক...

মুম্বাইয়ে অভিনেতা ইমরান খান আটক

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের...

ক্লাব ফুটবলে নেমেই জোড়া গোল করলেন মেসি

দেশের জার্সির মায়া কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর শূন্যতা ক্লাব ফুট...

চীনের অর্থনৈতিক সংকটের গভীরে লুকিয়ে থাকা নানা সমীকরণ

খাদের কিনারায় থাকা আবাসন বাজার চাঙ্গা করতে এবং শ্লথ হয়ে পড়া অর্থনীতিকে গতিশীল...

জেলেনস্কিকে সরাতে চান ট্রাম্প, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে তোলপাড়

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার পক্ষে মত দ...

জানুয়ারির মধ্যেই শুরু হতে পারে ইউপি নির্বাচন

আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে শুরু হতে পারে স্থ...

তালা ভেঙে অফিসে প্রবেশ করলেন চুয়েটের নতুন উপাচার্য

শিক্ষার্থীদের তুমুল আন্দোলনের মুখে নিয়োগের ২০ দিন...

রাহুলদের সাক্ষাতের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি

রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুর...

দুই অবসরপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

সন্ত্রাসবিরোধী এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়ের কর...

পদ্মায় ৩০ হাজার মিটার কারেন্টজাল জাল জব্দ

মাদারীপুর জেলার শিবচরের পদ্মা নদীতে অভিযান চালিয়ে...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা